রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছাত্রনেতা থেকে বঙ্গভবনের পথে দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ৩৮)
X


বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচনে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসার মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় রাজনীতি, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন মির্জা ফখরুল।

ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ সরকারের সময় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মির্জা ফখরুলের মা মির্জা ফাতেমা আমিন। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে পথচলার শুরু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় মির্জা ফখরুল বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ছাত্রজীবনের এই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর মির্জা ফখরুল শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করার পর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন।

সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে

১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। তবে সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন থাকেননি। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। এরপর স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। পরে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে ধাপে ধাপে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে উঠে আসেন।

সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী

বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। সংগঠনটির প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়ী হন। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

বিএনপির সংকটে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে মির্জা ফখরুল দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চলে যাওয়ার পর দেশে থেকে দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। দলের সাংগঠনিক দায়িত্বে ধাপে ধাপে এগিয়ে মির্জা ফখরুল শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে আসেন। দীর্ঘ সময় ধরে দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নতুন অধ্যায়

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনেই তার আসন রয়েছে। দলের দীর্ঘ সংকটময় সময়ে ভূমিকা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করছেন।

পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সিডনিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলার পর বঙ্গভবনে

ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব—বিভিন্ন পরিচয়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন তার সামনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের নতুন অধ্যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ ও মন্ত্রিত্বের পদ শূন্য হয়েছে। ফলে তার নির্বাচনী আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্বে কে আসছেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আ.দৈ/এসআর




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝