রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তারেক রহমানের সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাতে
হাদি হত্যার আসামি ও শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত চেয়েছে ঢাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৫ পিএম   (ভিজিট : ৪৯)
X

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। 

সোমবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন। তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করেছে, ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুততর করবে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদেরও বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে দেশে ফেরত দিতে দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে ঢাকা। শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে, গত বছরের ডিসেম্বরে গুলিতে নিহত হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি। হত্যাকাণ্ডের প্রায় আড়াই মাস পর মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকেই তাঁদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিতে নয়াদিল্লির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আসছে ঢাকা।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর প্রথম সাক্ষাত॥ সোমবার সকাল ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানান, বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে একটি উপযুক্ত ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভারতের নতুন হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান। এ সময় ত্রিবেদী ঢাকায় দায়িত্ব পালনের গত দুই মাসের অভিজ্ঞতাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।

বৈঠকটি এমন এক সময়ে হলো, যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত, সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকার দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও আগ্রহী। ‘প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলেছি’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব দিয়ে তোলা হয়েছে। ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে ভারত ইতিবাচক সাড়া দেবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামিরা ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে এসেছে। তাঁদের ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছে, বাংলাদেশ সেগুলো ইতোমধ্যে সরবরাহ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য এটাও অত্যন্ত সেনসিটিভ বিষয়। আমরা বলেছি, এই হত্যাকারীদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করতে।’ খলিলুর রহমানের মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে একটি ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ বা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। বৈঠকে এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট॥ সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে ঢাকার ক্ষোভের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। ভারতের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে বলেও তিনি জানান। ভারত এ ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বিষয়টি ‘দুঃখপ্রকাশের’ পর্যায়ের নয়। বরং কী ঘটেছে, সেটি বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের একটি আদালত শেখ হাসিনার বিচার করে তাঁকে দণ্ড দিয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন বা বক্তব্য দেয়ার জায়গা আদালত অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে এবং ভারত সরকার তাঁকে সেই সুযোগ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোর প্রতি আমরা চাই সারা বিশ্বের সব দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক।’ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো স্তম্ভকে খাটো বা দুর্বল করার মতো কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সেটিই ঢাকার প্রত্যাশা।

তবে নয়াদিল্লির বক্তব্য হলো, ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, ভারত সরকার তার কোনো অংশকেই সমর্থন করে না। সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন প্রসঙ্গও আলোচনায়॥ সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনায় এসেছে। তবে এগুলো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার বিষয় নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। খলিলুর রহমান বলেন, এসব বিষয় নিয়ে তিনি আগের দিনই ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্তে প্রাণহানি, পুশ-ইন, বাণিজ্য, পানি বণ্টন ও নিরাপত্তাসহ নানা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক পর্যায়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের পর্যায়েও নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন বলে মনে করছে ঢাকা।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের প্রথম বৈঠকটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ঢাকা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছে, অন্যদিকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির কথাও বলেছে। ফলে সোমবারের বৈঠক থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক ও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দুই পক্ষেরই রয়েছে। তবে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়, তার ওপর।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝