রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হামের চিকিৎসার খরচে বিপর্যস্ত পরিবার, ঋণ নিতে বাধ্য ৮৯ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ পিএম   (ভিজিট : ৫১)
X

দেশে হামের বিস্তার শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, হাজারো পরিবারের জন্য ভয়াবহ আর্থিক সংকটও তৈরি করেছে। আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে অধিকাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে, অনেকেই ভেঙেছে বহুদিনের সঞ্চয়, কেউ কেউ আবার বিক্রি করেছে নিজের সম্পদ। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ এক মূল্যায়ন জরিপে উঠে এসেছে এই চিত্র।

দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ৮৯ শতাংশ পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হয়েছে। 

জরিপ অনুযায়ী, হামের চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে প্রতিটি পরিবারের গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয় বহন করতে গিয়ে ৪ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করেছে, আর প্রায় ৩ শতাংশ পরিবারকে অন্যের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অংশগ্রহণকারী পরিবারের রোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের নিচে। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোগী মাত্র ৬ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবার জানিয়েছে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ৩৩ শতাংশ পরিবার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা এবং ২২ শতাংশ পরিবার খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারের ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকেই আয় হারিয়েছেন, এমনকি চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। রংপুরের হাজেরা খাতুনের অভিজ্ঞতা এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

 গত জুনে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে ইতোমধ্যে তাদের ৭০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

হাজেরা জানান, শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাকে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে কর্মরত তার স্বামী ওই মাসে বেতন না পাওয়ায় পরিবারটি আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম বলেন, মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়েছে যে অনেক পরিবার একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও আর্থিক সংকটের মুখে রয়েছে। তাই জরুরি নগদ সহায়তার পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নয়; অসুস্থ শিশুর পরিচর্যার কারণে বহু পরিবার আয় হারিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি।

বর্তমানে আইএফআরসি ও অন্যান্য অংশীদারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। একই সঙ্গে এক হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা এবং মানুষকে টিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছেন।

জরিপের ফলাফল বলছে, হামের প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝