নতুন সরকারের ছয় মাসে স্থবির ব্যাংকিং খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকে বহাল তবিয়তে ফ্যাসিষ্ট ব্যাংকাররা..
পাহাড়সম খেলাপী ঋণ..
নির্যাতনের খড়গ নেমেছে সরকার পন্থী ব্যাংকারদের উপর
গা-ছাড়া ভাব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা ধীরে মিইয়ে পড়েছে। খেলাপী ঋণে ব্যাংক ব্যাপক ছাড় দেয়া হলেও সরকারবিরোধী কর্মকর্তা রা মূল দায়িত্বে থাকার ফলে তাদের গাফলতিতে নিয়মিত হচ্ছে না বেশীর ভাগ ঋণ, দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে হতাশায় ঝিমিয়ে পড়ছে উদ্যোক্তারা। যার ফলে কমছে না খেলাপী ঋণ, বাড়ছে না বিনিয়োগ, তৈরী হচ্ছে না কর্মসংস্থান মোট কথা স্থবির হয়ে পড়ছে ব্যাংকিং খাত।
দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ কমাতে ২% ডাউন পেমেন্টে ঝণ নিয়মিতকরনের মেয়াদ বারবার বাড়ালেও আর্থিক খাতে ফ্যাসিষ্টদের দাপট থাকায় খেলাপী ঋণ বেড়েই চলছে, ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্নাধার রা দূর্নীতিগ্রস্থ হওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীন সুশাসন। খেলাপী ঋণ নিয়মিত না হওয়ায় তারল্য সংকটে বেশীরভাগ ব্যাংক। বেসরকারীখাতের ২/১ টা ব্যাংকে বাংলাদেশ পরিবর্তন আনলেও নতুন সরকার গঠন করার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেরও পরিচালনা পর্ষদ পূর্নগঠন করেনি সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
অর্থমন্ত্রনালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গা ছাড়া ভাবের কারনে পরিচালনা পর্ষদে পূর্বের পরিচালকদেন অনিয়ম এখনো বহাল তবিয়তে। দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন না দেখে আস্থা ফেরে নি বেশীর আমানতকারীদের, ফলে টাকা রাখতে এখন মানুষ ব্যাংকের পরিবর্তে অন্য জায়গা খুজছে। আস্থাহীনতাই ব্যাংক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এদিকে জুলাই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রায়ত্ব রুপালী ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছে। এ পদে থেকে তিনি রুপালী ব্যাংক জাতীয়তাবাদী আদর্শের নেতৃবৃন্দ, ফ্যাসিজম বিরোধী ও কর্মকর্তাদের জিয়া পরিষদেও লোকদেও ইচ্ছামতো বদলিন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার লিখিত অভিযোগে দেয়া হলে এখনো পদে বহালতয়িতে থেকে ফ্যাসিস্টদের এজেন্ডাা বাস্তবায়ন করছেন।
জানা গেছে দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি সহ সকল ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তিকে দূর দূরান্তে বদলি ও প্রমোশন বঞ্চিত করণসহ নানাভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে হয়রানি করছেন। দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যক্রম ব্যাংকটিকে স্বৈরতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট পরিবেশে ঠেলে দিচ্ছে।
শুধু রূপালী ব্যাংক নয়। অন্য ব্যাংকেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। সরকার গত ৫ মাসের বেশির সময়ে ব্যাংকিং খাত সংস্কারে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতের সুশাসন জোরদার, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সাম্প্রতিক মুদ্রানীতিতেও ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নীতিগত ঘোষণা ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি কাঙ্খিত ফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ, দুর্বল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কয়েক মাসের মধ্যে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কঠোর সংস্কার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের সংকট কেবল আর্থিক নয়, এটি সুশাসনেরও সংকট। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণে যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহির ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করেছে। তাই শুধু নতুন নীতি ঘোষণা নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে পরিচালন কাঠামো শক্তিশালী করা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ব্যাংকগুলোর প্রতি বাজারের আস্থা পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সতর্ক করেছে যে, সংস্কার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এবং বিশ্বাসযোগ্য কৌশলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্থাটি মনে করে, ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন ছাড়া সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ব্যাংক খাতের সমস্যা প্রকাশ্যে স্বীকার করা এবং সংস্কারকে নীতিগত অগ্রাধিকার দেওয়া। তবে এখনো সাধারণ গ্রাহকের দৃষ্টিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি, ঋণ পুনরুদ্ধারের গতি সন্তোষজনক নয় এবং অনেক ব্যাংকের মূলধন সংকটও বহাল রয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া এখনো কঠিন এবং উচ্চ সুদ ও কঠোর শর্তের কারণে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বলছে, ঝুঁকি কমাতে ঋণ বিতরণে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ অনুমোদনে সময় বেশি লাগছে এবং যাচাই-বাছাইও আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন বা নতুন বোর্ড গঠন করলেই ব্যাংকিং খাতের সংকট দূর হবে না। প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
বেসরকারি গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী মহলও বলছে, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ মূল্যায়ন, প্রয়োজন হলে ফরেনসিক অডিট এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তথ্য গোপন বা ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল না করে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে সংস্কারের ভিত্তি তৈরির চেষ্টা দেখা গেলেও সাধারণ গ্রাহক বা ব্যবসায়ীদের কাছে এর সুফল এখনো সীমিত। নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, মূলধন সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে আরও সময়, ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কারের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ঘোষিত পদক্ষেপ কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় তার ওপর।
আ.দৈ/আরএস




















