ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা
ধীরগতির নগরীতেও বাড়ছে প্রাণহানি,
ঝুঁকিতে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার সড়কে যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। যানবাহনের গতি কমে গেলেও সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ছয় বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৩৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও দুই হাজার ৪৮৮ জন।
নিহতদের বড় অংশই পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী, যা রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিরাপদ চলাচলের সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সংগঠনটির হিসাব বলছে, ২০২০ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত রাজধানীতে মোট এক হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও নারী ও শিশুরাও প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে রাতের বেলায়। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এরপর রয়েছে সকালের সময়। এই দুই সময়ের মধ্যে পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। রাতে তুলনামূলক ফাঁকা সড়কে ভারী যানবাহন ও পণ্যবাহী ট্রাক দ্রুতগতিতে চলাচল করে। অন্যদিকে সকালে কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার তাড়াহুড়ার কারণে যানবাহনের চাপ বাড়ে এবং অসতর্কতা থেকেও দুর্ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর কয়েকটি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় তুলনামূলক বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব স্থানে যানবাহনের চাপ, জটিল মোড়, দ্রুতগতির যান চলাচল এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের সীমিত সুযোগ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকার যানবাহনের গতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায়ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীতে বাসের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার। ব্যস্ত সময়ে এই গতি আরও কমে ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে আসে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকলে গড় গতি পাঁচ কিলোমিটারেরও নিচে নেমে যায়। বিশ্বের অনেক উন্নত শহরের তুলনায় এই গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। সময়ের সঙ্গে তা কমে প্রায় হাঁটার গতির কাছাকাছি পৌঁছেছে। বর্তমানে একজন মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ যানবাহনের গতি অত্যন্ত কম হলেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমছে না, যা বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের ধীরগতির কারণে নয়, বরং চালকদের অসচেতনতা ও বেপরোয়া আচরণই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, জেব্রা ক্রসিং এবং কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অভাব। ফলে কম গতির শহরেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ পথচারী এবং প্রায় ৩৯ শতাংশ মোটরসাইকেল আরোহী। বাকি প্রায় ১৮ শতাংশ বাস, রিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রী। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ এবং দুই চাকার যানবাহনের চালক ও আরোহীরা।
যানবাহনের ধরন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত রয়েছে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্যাংকার ও পিকআপ। এরপর রয়েছে মোটরসাইকেল এবং বাস। এছাড়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, জিপ, অটোরিকশা, সিএনজি ও লেগুনাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনায় জড়িত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্ঘটনার হার কমানো সম্ভব।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক চালক মানসিক চাপ ও অধৈর্যের মধ্যে থাকেন। সিগন্যাল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বাসচালকদের মধ্যে যাত্রী তুলতে প্রতিযোগিতামূলক আচরণও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। বিশেষ করে রাত ও ভোরে ফাঁকা সড়কে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। রাজধানীর বাসব্যবস্থাকে রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় এনে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিসি, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নিরাপদ পারাপারের অবকাঠামো বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ, ভারী যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব। পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারই নিরাপদ ঢাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।
আ.দৈ/আরএস




















