রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুর্নীতির মামলায় আসামি ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা পদোন্নতির তালিকায়
১৭৯ জনকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি, দুর্নীতিবাজদের নামা থাকায়, বিতর্কের মুখে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪২ পিএম  আপডেট: ১১.০৭.২০২৬ ৪:৫৪ পিএম  (ভিজিট : ৬১)
X

বিএনপি ক্ষমতায় গ্রহণের পরই দ্রুত প্রশাসনে ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রথম বড় প্রশাসনিক পদোন্নতি। তবে পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই সরকারের সহযোগি এবং বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে,এধরনের উদ্যোগ বিএনপি  সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাদের ভাষ্য, কীভাবে এ ধরনের ত্রুটি ঘটেছে তা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের পর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর গত  ৯ জুলাই) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূলত ২৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারাও এ তালিকায় স্থান পান।

তবে পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের পরই একের পর এক বিতর্ক সামনে আসে। এরমধ্যে তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তা এবং অতীতে আলোচিত দুর্নীতির মামলায় নাম জড়ানো কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এতে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশাসনে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত এ বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর/এপিএআর), জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা, বিভাগীয় মামলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অবসর-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। এসএসবির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন শেষে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

তবে এতগুলো স্তরের যাচাই-বাছাইয়ের পরও পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম উঠে আসায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব মো. মাইনুল হক ভুঁইয়া গত ৩০ জুন অবসরে গেলেও মাত্র নয় দিন পর, ৯ জুলাই প্রকাশিত যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকায় ৫৩ নম্বরে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরেও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

পদোন্নতির তালিকার ৬৭ নম্বরে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৫-এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং চিহ্নিত দুর্নতিবাজ ছাদেকুর রহমান। গত ঈদুল আজহার পর রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তিনি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান। তিনি ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক এজাজের সকল অপকর্মের সহযোগি ও সুবিধাভোগী ছিলেন।

এছাড়া,পদোন্নতির তালিকায় বগুড়ার সাবেক জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের নামও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার প্রশাসনিক ভূমিকা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছিল। এ কারণে তার পদোন্নতিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে, ২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। আলোচিত এ মামলায় তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আত্মসাৎ করা অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারার দাবি করে দুলাল চন্দ্র সূত্রধরসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছিলেন।

এমন অভিযোগের পরও যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকার ২৫ নম্বরে রয়েছে দুলাল চন্দ্র সূত্রধরের নাম। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, বিষয়টি পৃথক আইনি প্রক্রিয়াধীন। তিনি সর্বশেষ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
যুগ্ম সচিব পদোন্নতি ঘিরে নানা বিতর্কের বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সিনিয়র পর্যায়ের বিষয়। এখানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম চলে আসার মতো ভুল হওয়ার কথা নয়।

উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সিনিয়র পর্যায়ের বিষয়। এখানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম চলে আসার মতো ভুল হওয়ার কথা নয়। সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার

তিনি বলেন, ‌‘১৯৯৪ সালে আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব ছিলাম। তখন আমরা ৪৫০ কর্মকর্তাকে সিলেকশন গ্রেড দিয়েছিলাম। প্রক্রিয়া প্রায় একই ছিল। আল্লাহর রহমতে একটি ভুলও হয়নি।’

২৭তম বিসিএসের বঞ্চিত আরও ৭৭ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি:

 বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আত্মমর্যাদা বোধ, পেশাগত অঙ্গীকার ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে। আগে কর্মকর্তারা ভুল হলে জবাবদিহি ও সম্মানহানির ভয় পেতেন। এখন সেই সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এমন ঘটনা ঘটছে।
আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রশাসনের প্রথম বড় পদোন্নতি। ফলে এ সিদ্ধান্তে এমন বিতর্ক সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এটিকে সরকারের সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখবে। যদিও প্রতিটি কর্মকর্তার তথ্য প্রধানমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবের পক্ষে আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়, তবু শেষ পর্যন্ত সমালোচনার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়।
‘কোন কর্মকর্তার হাতে এই ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এটি গাফিলতির কারণে হয়েছে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে, সেটাও তদন্ত করা উচিত' বলেন সাবেক আমলা আবদুল আউয়াল মজুমদার।

নন-ক্যাডারে সহকারী সচিব হলেন ৩৪ কর্মকর্তা:
আবদুল আউয়াল মজুমদার আরও বলেন, বর্তমানে কর্মকর্তাদের সব তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত, শাস্তিপ্রাপ্ত বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নাম পদোন্নতির তালিকায় চলে আসা স্বাভাবিক প্রশাসনিক ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তৈরির ক্ষেত্রে অতীতে তথ্যগত ভুলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব ভুল প্রধানমন্ত্রীর নয়, বক্তব্য প্রস্তুতকারীদের। একটি তথ্য বহুবার মিলিয়ে দেখা উচিত। কর্মকর্তাদের তথ্য যেহেতু কম্পিউটার ডাটাবেজেই রয়েছে, তাই এমন ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাবেক এ সচিব বলেন, ‘এ বিষয়টি কোনোভাবেই ওভারলুক করা উচিত নয়। সরকারের উচিত কেন এই ভুল হয়েছে, তা খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

আ. দৈ./কাশেম



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝