ঢাকা দুই সিটি থেকেও বকেয়া কর আদায়ের উদ্যোগ
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকীকরণ সহ শতভাগ রাজস্ব আদায় ডিসি ফরিদা খানমের
নিজস্ব প্রতিবেদক :

ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরে ৮৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক এগিয়ে গেছেন। ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে শতভাগ সাফল্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে তিনি। চলতি জুন মাসের শেষ নাগাদ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, এখন শুধুমাত্র ঘোষণা দেওয়া বাকী বলে জানা যায়।
গত ২২ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে উপসচিব ফরিদা খানকে ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকার ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী ঢাকা জেলা প্রশাসক। তবে তিনি অত্যন্ত দক্ষ, সাহসী ও মেধাবী। ইতোমধ্যে সাফল্যের নজির স্থাপন করেছেন ডিসির দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই নানা চমক সৃষ্টি করে যাচ্ছেন তিনি।
ডিসি হিসেবে তিনি অধীনস্থ ও বিভাগীয় প্রধান, উপ প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করেন এবং সবার মতামত নিয়ে দ্রুত সিদ্বান্ত প্রদান করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা জেলা প্রশাসনকে সত্যিকারের জনবান্ধন এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলমান কার্যক্রমকে অধিকতর আধুনিকীকরণ করে যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক হিসেবে তিনি সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর বিশেষ নজর দিয়েছেন। এরমধ্যে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও জনগনের কাছ থেকে বকেয়াসহ ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে বেশ সফলতা অর্জন করেছেন।
এরআগে তিনি ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত একবছর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানেও সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। মাঠ পর্যায়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে তার অনেক। তিনি ২৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর চাকরি জীবনে রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে একাধিক উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন এবং ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কাজ করেছেন। মাঠ প্রশাসনে নীতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা ও তদারকির ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এছাড়া প্রেষণে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে উপপরিচালক ম্যাজিস্ট্রেট, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে উপপ্রধান এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এদিকে আজ রোববার (২১ জুন) ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরো আধুনিকীকরণ, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জনসেবার মানোন্নয়নে জেলা প্রশাসনের চলমান কার্যক্রমের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম গণমাধ্যমকে জানান, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি সংস্থাগুলোর পাওনা আদায়ে তিনি নিজেই সরাসরি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে প্রায় ৭ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কাছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া ছিল। বছরের পর বছর এই ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের কাছে বকেয়া পড়ে ছিল। কিন্তু ঢাকার দুই সিটির কর্তৃপক্ষ ওইসব বকেয়া পরিশোধের ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাতো না।
ঢাকা জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ আমি ( নিজে) জেলা কালেক্টর হিসেবে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার সরাসরি উপস্থিতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতিবাচক ভাবে নাড়া দিয়েছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি ইতোমধ্যে বকেয়া ১৫ কোটির মধ্যে ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে এবং অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে। অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও দ্রুত ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন,‘আমি যদি নিজে উদ্যোগ না নিতাম, তাহলে হয়তো এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হতো না। সরকারি রাজস্ব আদায়ে সবাইকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে সরকারি সংস্থাগুলোর বকেয়া না জমে। সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে’।
তিনি বলেন, ‘আমি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি যে, সংস্থার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন।’
তিনি বলেন, ‘অফিসের কাজের বাইরে প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পাওনা আদায়ের বিষয়ে যোগাযোগ করবেন।’
তিনি জানান, ‘রাজউক, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছেও জেলা প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাওনা রয়েছে। এসব আদায়ে কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন’।
বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ডিসি ফরিদা খানম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই ঢাকাকে আরো সবুজ, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করতে।
তিনি আরো বলেন, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসন নিয়মিত কাজ করছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক বলেন, চলতি অর্থবছরে ৮৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরে এই লক্ষ্য আরো বাড়তে পারে বলে জানান। তিনি বলেন, সম্ভবত আগামী অর্থবছরে আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেই হবে না, সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। আমরা সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।
দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে লিজ নেওয়া জমির যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদা খানম বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজন হলে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে সরকারি জমি লিজ নিয়েছে। তারা লিজের শর্ত অনুযায়ী জমি ব্যবহার করছে কি না, তা আমরা যাচাই করব।
যদি দেখা যায় কেউ নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে জমি ব্যবহার করছে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা প্রশাসনের অধীনস্থ ভূমি অফিসগুলোতে সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ফরিদা খানম বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, আমাদের কর্মকর্তারা দিন-রাত পরিশ্রম করেন রাষ্ট্রের কল্যাণে। আমি সবসময় তাদের বলি, আমরা শাসক হিসেবে নয়, জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করব। জনগণের করের টাকায় আমাদের বেতন হয়। তাই সেই দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, যদি কোথাও কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি বা সেবায় অবহেলার অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সচেতন নাগরিকরা জেলা প্রশাসনকে জানাতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণ হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফরিদা খানম বলেন, উন্নয়ন, সুশাসন, রাজস্ব আদায়, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র একা সব দায়িত্ব পালন করতে পারে না। সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। ছোট ছোট উদ্যোগ একসময় বড় পরিবর্তনের জন্ম দেয়।
আ. দৈ/ কাশেম




















