সিআইডির খসড়া চার্জশিট
কেন্দ্রিয় ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর আতিউরসহ রিজার্ভ চুরিতে জড়িত ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নজিরহিীন ঘটনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টা বেরিয়ে আসছে। এরমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর আতিউর রহমানসহ ১০ জনের নাম পাওয়া গেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পক্ষ থেকে তৈরি চার্জশিটে এসব চাঞ্চল্যকর কখ্য বেরিয়ে এসেছে।
এই বিষয়টি নিয়ে আইনি পরামর্শের জন্য খসড়া চার্জশিট অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির এ ঘটনায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সিআইডি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট ও খসড়া চার্জশিটে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পাওয়া বিস্তৃত ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘ তদন্তে দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা নথি, ডিজিটাল আলামত ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভিযোগপত্রটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। চুরির ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিআইডি শুরু থেকেই মামলাটি তদন্ত করছে।
গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে রিজার্ভ চুরির মামলা তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে গত ১ এপ্রিল খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগপত্র সংক্রান্ত আইনি পরামর্শও চাওয়া হয়।
খসড়া অভিযোগপত্রে মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬, নর্থ কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, জাপানের ১, ভারতের ৪ এবং বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তদন্তে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নানা গাফিলতি, ঘটনা গোপন করা, আলামত মুছে দেওয়ার চেষ্টাসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে চার্জশিটভুক্ত না করতে অদৃশ্য চাপ আসে। তবে চূড়ান্ত চার্জশিটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন প্রধান আতিউর রহমান আসামির তালিকায় রয়েছেন।
রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছালো ৯২ বার:এছাড়া ওই সময়ের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কে এম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম, তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহাসহ ৯ কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
ফিলিপাইনের আসামি যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের কাম সিন ওং, মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্তর ও পিনেদা, রোমুয়ালদো এস আগারাডো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস টরেস, লোরেঞ্জো তান, মিস ন্যান্সি, জাও কিওগ, ডেনিস সি ব্যানকোড, ইসমায়েল আর রেইস, সাবিনো এম ইকো, মিস লিজেন্ড জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসাইন, উইলিয়াম সোঁ গো (মৃত্যুবরণ করেছেন), সালুদ রেইস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্থনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফাব্রেগাস খো, ম্যান পো চান, মিং ই সাইমন সি, রোজালিও পরানতা তান্দুয়ান, এনরিকে কে রাজোন, থমাস আরাসি, জোসে এডুয়ার্ডো জে আলারিলা, ক্রিশ্চিয়ান আর গনজালেস, ডোনাটো সি আলমেইদা ও ফ্লিন্ট রিচার্ডসনের নাম এসেছে। এছাড়া দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন, ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ইনকরপোরেশন, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেশন, মিডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর নাম রয়েছে আসামির তালিকায়।
শ্রীলঙ্কার ৭ ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত
শ্রীলঙ্কার আসামির মধ্যে হেগোডা গামাগে শালিকা পেরেরা, ইমিয়াগে ডন মিউরিন রানাসিংহে, রামানায়েক আরাচ্চিগে ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, বুলুগাহা আরামবেগেদারা সাঞ্জিবা তিসা বান্দারা, ওয়েরাপুলি মুহান্দিরামগে প্রিয়াঙ্কা জয়দেব, লুয়াইস হান্নাদিগে শিরানি ধম্মিকা ফার্নান্দো ও নিশান্ত নলক ওয়ালাকুলু আরাচ্চি নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে শালিকা ফাউন্ডেশনের নাম রয়েছে।
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুনের আগে রিজার্ভ চুরির মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ কবির। ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে তিনি মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি রিজার্ভ চুরির প্রধান অভিযুক্তকে চিহ্নিত করেন।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত রিজার্ভ চুরির মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ ইয়াসিন। তার সময়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলাটির তদন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে হন্তান্তরের প্রক্রিয়া চলে।
সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
যদিও জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই চেষ্টা বিফলে যায়। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত রিজার্ভ চুরির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মং থোয়াই মারমা। রিজার্ভ চুরির মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান। তিনি ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত করেন। সেসময় তিনি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলআর) মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অপরাধ সংশ্লিষ্টতার তথ্য সংগ্রহ করেন। চুরি যাওয়ার অর্থের ৩৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দেশে ফিরে আনাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন।
আ. দৈ./কাশেম




















