জলবায়ু সংকটে প্রতিবছর ক্ষতি ১৭৮ কোটি ডলার: জরুরি কর্মপরিকল্পনার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি দেশের শ্রম, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার—যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ।
আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ’ আয়োজিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে “জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের নির্বাহী সমন্বয়ক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। গোলটেবিল বৈঠকে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ)-এর প্রোগ্রাম অফিসার মোঃ জুবায়ের আলম এবং স্বাগত বক্তব্য দেন বিএলএফ-এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাইসুল ইসলাম খান। আলোচনায় জাতীয় ও খাত-ভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন, সিভিল সোসাইটি, পরিবেশ অধিকার আন্দোলন এবং যুব ও নারী নেতৃত্ব অংশ নেন।
আলোচনায় জানানো হয়, ২০২৪ সালের তীব্র তাপপ্রবাহের পর ২০২৬ সালেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করেছে যে, চলতি জুন-আগস্ট সময়ে 'এল নিনো' परिस्थिति সৃষ্টির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, যা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
বক্তারা বলেন, চরম তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ সংকট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শ্রমিকেরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কাজ করছেন। কর্মক্ষেত্রে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, মাথা ঘোরা এবং কিডনি জটিলতার মতো সমস্যা বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা না নিলে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এবং ১০ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বৈঠকে অংশ নিয়ে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, আমাদের শিল্পনীতিতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু শ্রমিকদের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারপারসন কুতুবউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবেই, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জেতা সম্ভব নয়।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ফারজানা ইয়াসমিন জানান, আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে শুধু মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে; এখন টেকসই উন্নয়ন আর বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন। ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুর সিসাজনিত বুদ্ধিবিকাশ সমস্যার কথা উল্লেখ করে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানান। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির কল্পনা আক্তার বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর দ্বিচারিতার সমালোচনা করে বলেন, তারা একদিকে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’র কথা বলে, অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দেয় না।
জেটনেট-এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, নীতিনির্ধারকেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থাকলে বাস্তবমুখী রূপান্তর সম্ভব নয়; সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কৃষিজমির পরিবর্তে অনাবাদি জমিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, বৈশ্বিক স্লোগানের প্রতিফলন শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবনে খুব কমই দেখা যায়। তিনি শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, জলবায়ু-সহনশীল আবাসন এবং নিরাপদ গণপরিবহনকে যৌথ দরকষাকষি চুক্তির (BCA) অংশ করার আহ্বান জানান।
একই সাথে বৈশ্বিক জলবায়ু ফোরামে শ্রমিকদের সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরার জন্য একটি সমন্বিত 'যৌথ পজিশন পেপার' প্রণয়নের ওপর জোর দেন। সংকট মোকাবিলায় বৈঠকে বক্তারা কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘তাপ সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন, নগর সবুজায়ন ও প্রাকৃতিক জলাধার দ্রুত পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বেশ কিছু জরুরি দাবি ও সুপারিশ পেশ করেন।
বক্তারা একমত হন যে, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন ও মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ করলে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল ও ন্যায্য উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে।
আ.দৈ/আরএস/এএইচএইচজ




















