রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশে এবারও কোরবানীর চামড়ার নিয়ে শঙ্কা
আবুল কাশেম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম   (ভিজিট : ৫০)
X

কোরবানীর চামড়া হতাশা যেন কাটছে না।  ট্যানারির মালিকরা শুধু ঢাকার সাভার চামড়া শিল্পনগরীতেই ঈদ ও ঈদের পরের দিনে সংগ্রহ হবে ছয় লাখ পিস। প্রায় এক লাখ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করবেন পুরান ঢাকার পোস্তার ব্যবসায়ীরা।  তবে সারাদেশে অনেক চামড়া নিয়ে বিপাকে আছেন লোকজন।  এদিকে, সরকার নির্ধারিত চামড়ার দাম কিছুটা বাড়লেও এবারও ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। আর চামড়া সংগ্রহে সাভার ট্যানারি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবার প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির সময় পুরো বছরের প্রায় ৪৫-৫৫ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ হয়। এ বছর গরু, ছাগল ও মহিষ মিলিয়ে প্রায় এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। শুধু সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতেই ঈদের দিন ও পরদিন প্রায় ছয় লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হতে পারে।  সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং সারা দেশে বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৭ এবং ২০ থেকে ২২ টাকা।

তারা বলছেন, লবণের দাম এবার সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যদিও কেউ কেউ দাবি করছে দাম একটু বাড়তি রয়েছে। এরইমধ্যে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক আসা শুরু করেছে, তাদের প্রস্তুতি ভালোই।

দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এটি এ বছরের সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর।  সরকারের পক্ষ থেকে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ঢাকায় প্রতি বর্গফুটে গড়ে ২ টাকা এবং ঢাকার বাইরে সমপরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার চেষ্টা করবেন ট্যানারি মালিকরা। তবে সময় মতো লবণ না দিলে বা সংরক্ষণে দেরি হলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হবে, তখন ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে না। কোরবানির ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের পরামর্শ তাদের।

 বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সারা বছরের মোট চামড়ার প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ কোরবানির সময় সংগ্রহ হয়। এ কারণে আমাদের আগেভাগেই প্রস্তুতি ও মজুত নিশ্চিত করতে হয়। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা সেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। এ বছর গরু, ছাগল ও মহিষ মিলিয়ে প্রায় এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। শুধু সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতেই ঈদের দিন ও পরদিন প্রায় ছয় লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হবে।’

তিনি বলেন, গত দুই মাস ধরে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কিছুটা মন্দা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও অনেক ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।  লবণের দামের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, লবণের দাম এ বছর সহনীয় পর্যায়ে আছে। অতটা বাড়েনি। এছাড়া চামড়া সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরাও আসা শুরু করেছেন।

চামড়ার দাম পাওয়া যাবে তো এমন প্রশ্নের উত্তরে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনার চেষ্টা করবেন। তবে সময়মতো লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করলে বা চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে না। আমাদের পরামর্শ থাকবে, কোরবানির চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে যেন চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। তাহলে মানুষ চামড়ার ভালো দাম পাবে।

এদিকে, আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কাঁচা চামড়া সংগ্রহে প্রায় এক লাখ পিসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএইচএসএমএ)। তবে সাভারের হেমায়েতপুরে শিল্পনগরী স্থানান্তরের কারণে আগের মতো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সংগঠনটির মহাসচিব টিপু সুলতান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের টার্গেট আছে এক লাখ পিস। কিন্তু হেমায়েতপুরে যাওয়ার কারণে আড়তদারদের অনেক সমস্যা হয়েছে। এ কারণে আমরা মনে করছি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নাও হতে পারে, সংগ্রহ কিছুটা কম হতে পারে।’  কেনা হবে ১ কোটি চামড়া, এবারও দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কাঢাকার পোস্তায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লবণ দেওয়া হবে, ফাইল ছবি

চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণের বাজার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিপু সুলতান। তার ভাষায়, ‘লবণের কৃত্রিম সংকট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ৭৫০ টাকার মার্কেট ৯৫০ থেকে ১০৫০ টাকা হয়ে গেছে। এটা এক ধরনের কৃত্রিম সংকট। আমরা চেষ্টা করছি লবণের দাম নাগালের মধ্যে আনা যায় কি না।’

চামড়ার দাম প্রসঙ্গে টিপু সুলতান বলেন, সরকার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে বাস্তবে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং সহায়তার ওপরই নির্ভর করবে কাঁচা চামড়ার বাজার।  
তিনি বলেন, ‘আমার প্রেডিকশন হচ্ছে প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে মানুষ সঠিক দাম পাবে কি না, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।’  

ব্যাংক থেকে ঋণ কম পেলে বাজারে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন টিপু সুলতান। ‘যদি ক্যাশ ওভারফ্লো থাকে, ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ থাকে তাহলে দাম পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর যদি ব্যাংক কম টাকা ফাইন্যান্স করে, তাহলে প্রবলেম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ যোগ করেন তিনি।

প্রস্তুতির বিষয়ে বিএইচএসএমএর মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের ওয়্যারহাউজ, লবণসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন। এখন শুধু এক্সিকিউশনের অপেক্ষা।’  কেনা হবে ১ কোটি চামড়া, এবারও দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কাসাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কোরবানির চামড়াবাহী পিকআপ প্রবেশ করছে, ফাইল ছবি

এদিকে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়েছে। কিছুটা সংস্কার হয়েছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত এবং প্রতিস্থাপন হয়েছে। সংস্কার হয়েছে কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনের। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারণে মজুত করা হয়েছে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল।

এ বিষয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ  বলেন, ‘কোরবানি সামনে রেখে আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। পুরো ওভার হোলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া দুটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। পুকুরের সঙ্গে সংযুক্ত রাস্তার কাজও চলমান, যা কোরবানির আগেই শেষ হবে। এতে কঠিন বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণে কোনো সমস্যা হবে না।’  তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো অসুবিধা হবে না।’

ক্রোম শেভিং ডাস্ট অপসারণ প্রসঙ্গে সিইটিপির এমডি বলেন, ‘জেডএফ আর অ্যানিমেল ফিডিং কোম্পানি নিয়মিত আমাদের কাছ থেকে ক্রোম শেভিং ডাস্ট নিয়ে যাচ্ছে। তারা ইতোমধ্যে চার হাজার মেট্রিক টনের বেশি ডাস্ট অপসারণ করেছে। ঈদের পর আবারও তারা নিয়মিতভাবে ডাস্ট নেওয়া শুরু করবে।’

চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারাবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় ২০ কোটি টাকার লবণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণও।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম গলমাধ্যমকে বলেন, ‘কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ২০ কোটি টাকার লবণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লবণ বিতরণ থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, প্রচার-প্রচারণা, মনিটরিং কমিটি ও কন্ট্রোল রুম—সব কার্যক্রম চালু রয়েছে। সিইটিপির কেমিক্যাল, ইঞ্জিন ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করছি, এবার চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে বড় কোনো সমস্যা হবে না।’

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা নিশ্চিত করতে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে একাধিক সভা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে সংরক্ষিত চামড়া যথাযথভাবে সংগ্রহ করা হয়। মানুষের সহযোগিতা ও গণমাধ্যমের প্রচারণা থাকলে এবার চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’

আ. দৈ./ কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝