জুলাই সনদ ও আমেরিকা চুক্তি বাতিলের দাবিতে ঈদের পরেই উত্তপ্ত রাজপথ
নিজস্ব প্রতিবেদক

উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক আকাশে জমছে নতুন করে সংঘাত ও অস্থিরতার মেঘ। একদিকে 'জুলাই সনদ' পুরোপুরি বাস্তবায়ন এবং আমেরিকার সঙ্গে হওয়া সাম্প্রতিক চুক্তি বাতিলের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু, অন্যদিকে দলগুলোর মধ্যে তীব্র পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও সরাসরি অ্যাকশনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি দ্রুত জটিলতার দিকে মোড় নিচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দেশের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেক স্বাধীন বিশ্লেষক ও বামপন্থী নেতা। তাদের মতে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম, কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, তীব্র বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর মৌলিক সমস্যাগুলো থেকে জনগণের মনোযোগ ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দিতেই এই কৃত্রিম সংঘাত তৈরি করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। একটি গণতান্ত্রিক আবহ তৈরি হওয়ার পর মাঠের রাজনীতিতে এমন উসকানিমূলক আচরণ এবং উগ্র শব্দ প্রয়োগ মোটেও কাম্য নয় বলে মনে করেন তারা।
ইতোমধ্যেই মাঠের আন্দোলনকে আরও বেগবান করার ঘোষণা দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটের নেতারা জানিয়েছেন, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবিতে তারা ইতিমধ্যে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য স্পিকারের কাছে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছেন। এই দাবিতে ঈদের পর সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করছেন তারা।
পাশাপাশি, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথ তপ্ত করার স্পষ্ট আভাস দিয়ে রেখেছে। জানা গেছে, আগামী জুন মাসের বাজেট অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সংসদে ওয়াকআউটসহ বিভিন্ন ধরনের সংসদীয় ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবাদের ছক কষছে দলটি।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এখন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে চলছে চরম দোষারোপের রাজনীতি। কেউ কেউ একে একটি 'অদৃশ্য শক্তির' গভীর চাল হিসেবে দেখছেন, যার মূল লক্ষ্য দেশের সদ্য অর্জিত স্থিতিশীল পরিবেশকে চিরতরে নষ্ট করা। এনসিপি ও বিরোধী জোটের নেতাদের একাংশের স্পষ্ট দাবি—নিজেদের ব্যর্থতা, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজির মতো গুরুতর ইস্যুগুলো ধামাচাপা দিতেই সরকার পরিকল্পিতভাবে বিরোধীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করছে। অপরদিকে, বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মনে করেন, দেশের সাধারণ মানুষ কেবল শান্তিশৃঙ্খলা চায়; কিন্তু একটি বিশেষ গোষ্ঠী ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সব দল ও পক্ষ যদি এখনই সর্বোচ্চ সহনশীলতার পরিচয় না দেয়, তবে আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ চরম সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে। নিজেদের দলীয় এজেন্ডা বাদ দিয়ে জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে এবং সবাইকে অবিলম্বে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এই নতুন দফার রাজনৈতিক উত্তাপের সূত্রপাত হয়েছে ঝিনাইদহের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গত ২২ নভেম্বর জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ এবং তার কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরাসরি বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সহযোদ্ধাদের ওপর কোনো ধরনের সহিংসতা হলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, যার প্রমাণ তারা বিগত জুলাই অভ্যুত্থানেই হাতেনাতে দেখিয়েছেন।
তবে এনসিপির এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাদের দাবি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেই সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উসকানি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি (মব) তৈরি করতে গিয়েছিলেন এবং ক্ষুব্ধ সাধারণ জনগণই কেবল তার প্রতিবাদ করেছে। এদিকে মাঠের এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মন্তব্য করেছেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু ভিন্নমতের কারণে সহিংসতা বা অপমানজনক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আ.দৈ/আরএস/এ এইচ এইচ




















