এবারে কোরবানি পশুর বাজার ছাড়াবে ৭০ হাজার কোটি টাকা
শাহীন রহমান

ন্যায্যমুল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় খামারিরা ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় খামারিরা ভালো দাম পাবে
বাজারে গিয়ে দেখা গেছে মাঝারি আকারের গরুর দাম এখনও বেশ চড়া
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের বড় চ্যালেঞ্জ “দাম ও ক্রয়ক্ষমতার ভারসাম্য”
রোববার থেকে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনবানি পশুর হাটে বেচাকেনা শুরু হচ্ছে। যদিও আগেই হাটে আসতে শুরু করেছে গরু মহিষ ছাগলসহ গবাদিপশু। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর বলছে এবারের প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখের কাছাকাছি পশু কোরবানীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যা চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ বেশি।
ফলে অন্য বারের ন্যায় এবার কোরবানির বাজারও বিশাল আকার নিচ্ছে। রাজধানীসহ সারাদেশে ৩ হাজার ৬শ’ হাটে পশু বেচাকেনা হবে। এই হিসেবে দেশে এবার কোরবানির বাজার হতে পারে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রাজধানীতে এবার অস্থায়ী পশুর হাট বসছে ২১টি। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশন ইজারা দিয়েছে ১১টি। দক্ষিণ সিটিতে বসছে ১০টি হাট। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি স্থায়ী গবাদিপশুর হাট রয়েছে ঢাকায়। যেখানে সারা বছরই কেনাবেচা চলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাবতলী গরুর হাট। সবগুলোতে হাটেই কোরবানি উপলক্ষ্যে ঈদের দিন পর্যন্ত কেনাবেচা হবে।
এর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আনুষ্ঠানিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, এবছর দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ। এর বিপরীতে কোরবানি হতে পারে এক কোটি এক লাখ। সে হিসাবে এবার কোরবানির পর সোয়া ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর বলছে এবারে কোরবানির পশুর মধ্যে প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষের চাহিদা রয়েছে।
এছাড়া রাজধানীতে যেসব পশুর হাটের ইজারা দেয়া হয়েছে সেখানে গরু বেচাকেনা হয় হয় প্রায় ৯০ ভাগের বেশি। গরুর দাম অন্য পশুর তুলনায় বেশি হওয়ায় বাজার বিশাল আকার ধারণ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে কোরবানির পশুর বাজার এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। খামার, পশুখাদ্য, পরিবহন, চামড়া, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, হাট ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে এ খাতে সক্রিয় থাকে লাখো মানুষ। ২০২৩ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে কোরবানির হাটে প্রায় ৯৪ লাখ ৪৩ হাজার পশু বিক্রি হয়েছিল। এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৬১ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৮১ হাজার। সেই বছর মোট বেচাকেনার পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এছাড়া ২০২৪ সালে দেশে কোরবানি হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখের বেশি পশু। যদিও মোট বাজারমূল্যের সরকারি পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে বাজার বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা বাজার ৭০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। কারণ পশুর সংখ্যা, খাদ্য খরচ, পরিবহন ব্যয় ও গরুর গড় দাম সবই বেড়েছে। এখন পর্যন্ত যে ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, তাতে এ বছর কোরবানির বাজারও বিশাল আকার নিচ্ছে। দেশে এবার প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখের কাছাকাছি পশু প্রস্তুত রয়েছে। সারা দেশে ৩ হাজার ৬শ’-এর বেশি পশুর হাট বসছে। এবার পশুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের ধারণা, কোরবানির বাজারও ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের মাইলফলক ছুঁতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোরবানির বাজারের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে গ্রামে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ে। ক্ষুদ্র খামারি থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিক সবার আয়ের বড় উৎস হয়ে ওঠে এই মৌসুমি বাজার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় এবার ভারতীয় গরুর প্রবেশ তুলনামূলক কম হতে পারে। এতে দেশীয় খামারিরা কিছুটা ভালো দাম পেতে পারেন। অনেক ব্যাপারী আশা করছেন, শেষ সপ্তাহে বাজার চাঙা হবে এবং বড় গরুর চাহিদা বাড়বে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের হিসাব ভিন্ন। বাজারে গিয়ে তারা দেখছেন, মাঝারি আকারের গরুর দাম এখনও বেশ চড়া। গত বছরের তুলনায় অনেক হাটে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মোটা তাজাকরণ ছাড়া দেশি গরুর দাম বেশি হাঁকছেন বিক্রেতারা। রাজধানীর কয়েকজন সম্ভাব্য ক্রেতা জানিয়েছেন, পরিবারের বাজেটের কারণে এবার তারা ছোট বা মাঝারি আকারের পশুর দিকে ঝুঁকছেন। অর্থনৈতিক চাপের কারণে যৌথ কোরবানির প্রবণতাও বাড়ছে।
খামারিরা বলছেন, উৎপাদন খরচ না বুঝে শুধু বাজারদর নিয়ে আলোচনা করলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। তাদের দাবি, কয়েক বছর আগেও যে খাদ্য ২৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। পশুর ওষুধ ও টিকাও বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে লাভ করতে হলে পশুর ন্যায্য দাম প্রয়োজন। এদিকে প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, দেশে এখন কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। কয়েক বছর আগেও ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও বর্তমানে দেশীয় খামারিরাই চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে “দাম ও ক্রয়ক্ষমতার ভারসাম্য”। কারণ সরবরাহ বেশি হলেও মানুষের হাতে নগদ অর্থের সংকট রয়েছে। ফলে হাটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দরদাম নিয়ে টানাপোড়েন চলতে পারে। তাদের মতে, যদি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকে এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট না হয়, তাহলে দেশীয় খামারিরা মোটামুটি ভালো দাম পেতে পারেন। তবে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বেন।
এবারের কোরবানির বাজার তাই একদিকে স্বস্তির, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার। চাহিদার তুলনায় লাখ লাখ পশু বেশি থাকলেও খামারিদের মনে প্রশ্ন একটাই শেষ পর্যন্ত লাভ হবে তো?” সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে হাট জমে ওঠার পর, যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার দর কষাকষিতে নির্ধারিত হবে এবারের কোরবানির বাজারের আসল চিত্র।
অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের হিসাবও ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ এবার ছোট বা মাঝারি আকারের পশুর দিকে ঝুঁকছে। অনেকে আবার যৌথ কোরবানির পরিকল্পনা করছেন। কারণ নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে বড় বাজেটের কোরবানি অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “গত বছর যে গরু ১ লাখ টাকায় পাওয়া গেছে, এবার সেটার দাম চাওয়া হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার। সংসারের খরচ সামলে এত বড় বাজেট করা কঠিন।
খামারিদের অভিযোগ, গত এক বছরে গোখাদ্য, ভুসি, খড়, ভুট্টা, সয়াবিন খৈল, ওষুধ, টিকা ও শ্রমিক খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক দফায়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে সে অনুপাতে দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। গাজীপুরের খামারি আবদুল মালেক বলেন, “একটা গরু পালতে এখন আগের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি খরচ হচ্ছে। কিন্তু বাজারে ক্রেতারা আগের দামেই গরু কিনতে চান। লাভ না হলে আগামী বছর খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
একই ধরনের শঙ্কা দেখা যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের খামারিগুলোর মধ্যেও। দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় হাজার হাজার গরু প্রস্তুত করা হলেও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। অনেকেই বলছেন, বাজারে পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শেষ সময়ে দাম পড়ে যেতে পারে। কুমিল্লার খামারিরা আবার অন্য শঙ্কায়। তাদের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু ঢুকলে স্থানীয় বাজার ধস নামতে পারে। যদিও প্রশাসন বলছে, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও কঠিন। খামারিরা বলছেন, খাদ্যের উচ্চমূল্য, ব্যাংকঋণের জটিলতা এবং গরু চুরির কারণে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। গত দেড় বছরে জেলায় শত শত ছোট খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
দিনাজপুর জেলায় চার লাখের বেশি পশু প্রস্তুত করা হলেও দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা। একই অবস্থা কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলেও। কুমিল্লায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ১২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে পশু ঢোকার আশঙ্কায় স্থানীয় খামারিরা উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে গরু প্রবেশ করলে স্থানীয় বাজারে দাম পড়ে যাবে। জেলায় এবার প্রায় ৩৫ হাজার পশুর ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
তবে দেশের অধিকাংশ জেলায় চাহিদার তুলনায় পশুর জোগান বেশি। হবিগঞ্জে চাহিদা ৪৬ হাজার হলেও প্রস্তুত রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি পশু। স্থানীয় খামারিরা আশা করছেন, বাজার ভালো থাকলে তারা লাভ করতে পারবেন। পটিয়াতেও একই চিত্র। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, স্থানীয় চাহিদার চেয়েও বেশি পশু মজুদ রয়েছে। তবে গরু চুরি ও নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ রয়েছে খামারিদের মধ্যে।
দেশীয় খামারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা॥ একসময় কোরবানির বাজারে ভারতীয় গরুর আধিপত্য থাকলেও গত এক দশকে চিত্র বদলে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন দেশীয় খামারিরাই প্রায় পুরো চাহিদা পূরণ করছেন। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, খামারিদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, কৃত্রিম প্রজনন এবং স্থানীয় জাত উন্নয়নের ফলে দেশে পশু উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এবারও দেশীয় খামার থেকেই পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে দাবি তাদের।
হাটে বাড়ছে অনলাইন বেচাকেনা॥ প্রযুক্তির প্রসারে অনলাইনেও কোরবানির পশু বিক্রি বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে হাজার হাজার পশুর বিজ্ঞাপন উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানীর ব্যস্ত মানুষ এখন অনলাইনেই পশু দেখে বুকিং দিচ্ছেন। খামারিরাও সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন এ পদ্ধতিতে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন বেচাকেনা বাড়লেও দেশের মোট বাজারের বড় অংশ এখনও প্রচলিত হাটকেন্দ্রিক।
আ.দৈ/আরএস




















