বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব, শিল্পমালিক ও ব্যবসায়িদের হুশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী ৬টি সরকারি সংস্থা ও কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এই সংস্থাগুলো তাদের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) এ সংক্রান্ত একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে শুধু দাম বাড়ানোর প্রস্তাবই আসেনি, বরং গ্রাহক শ্রেণি পুনর্নির্ধারণ, প্রি-পেইড মিটারে নতুন ধরনের চার্জ আরোপ, বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনা এবং শিল্প গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টির মতো একাধিক প্রস্তাব সামনে এসেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা উত্তর বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) এই ছয়টি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্যে দেখা যায়, বিতরণ লাইনে গড় সিস্টেম লস ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও কিছু কিছু সংস্থায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তবে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর এসব প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন দেশের শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশীয় শিল্প খাত এমনিতেই টিকে থাকার লড়াই করছে। এই অবস্থায় নতুন করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তা বহন করার মতো ক্ষমতা শিল্প খাতের নেই।
এদিকে গণশুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী ছয়টি সংস্থার মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটিতে। এর মধ্যে সিংহভাগই সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহক, যার সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গণশুনানিতে জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ট্যারিফ বজায় থাকলে তাদের প্রতি ইউনিটে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২৯ পয়সা। এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় করার অজুহাতে তারা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।
একই সঙ্গে সংস্থাটি একটি নতুন নিয়ম চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত নিম্নচাপ (এলটি) গ্রাহকসীমা রয়েছে, যা কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোড ব্যবহারকারী গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মধ্যচাপ (এমটি) গ্রাহকশ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পিডিবির দাবি, বর্তমানে ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোডের গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যার ফলে একই ট্রান্সফরমার থেকে সীমিত সংখ্যক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া, মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ ট্যারিফ থেকে সরিয়ে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
এবার দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও লোকসান এড়িয়ে সংস্থাটিকে সচল রাখতে এই মূল্য কমপক্ষে ৯ টাকা করা জরুরি।
পাশাপাশি, তারা দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ‘লাইফলাইন’ সুবিধা আরও সংকুচিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের অনুমোদিত লোড ১ কিলোওয়াট বা তার কম এবং মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, কেবল তারাই লাইফলাইন সুবিধা পাবেন। এর বাইরে ব্যাটারিচালিত চার্জিং স্টেশনগুলোর জন্য আলাদা গ্রাহকশ্রেণি তৈরি করা, ইটভাটা ও চিলিং সেন্টারগুলোকে বাণিজ্যিক থেকে শিল্পশ্রেণিতে রূপান্তর করা এবং বহুতল ভবনে একাধিক শিল্প সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারেও তারা সুপারিশ করেছে।
ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চল ও মিরপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ডেসকো জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত তিন বছরে তাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।
এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও ঘাটতি মোকাবিলা করতে সংস্থাটি গড়ে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব পেশ করেছে। ডেসকো তাদের আবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, প্রি-পেইড গ্রাহকদের জন্য বর্তমানে যে রিবেট বা ছাড় সুবিধা চালু আছে, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে ডিমান্ড চার্জের পরিমাণও বাড়ানো দরকার।
রাজধানীর একাংশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমান পরিচালন ব্যয়ের কারণে তাদের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাবে।
দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো জানিয়েছে, বিগত দিনগুলোতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ের ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের ৮৫ পয়সারও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংস্থাটি আবাসিক লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ইজিবাইক চার্জিং স্টেশনগুলোকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় এনে রাজস্ব বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে তারা।
উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি নেসকো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সায় গিয়ে পৌঁছাবে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং নতুন পাইকারি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে খুচরা ট্যারিফ পুনর্র্নিধারণ বা বাড়ানোর জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।
একইভাবে, কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ নয় বলে মত দিয়েছে টিইসি। কমিটি আরও যোগ করেছে, যেসব গ্রাহকের নন-ডিমান্ড মিটার রয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত লোড নির্ধারণ করা অন্যায়। এর পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় ডিমান্ড মিটার স্থাপন করা উচিত।
এদিকে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির এই হিড়িকের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও আপত্তি জানিয়েছেন দেশের শিল্প খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা। তারা বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমানে শিল্প খাত স্রেফ টিকে থাকার লড়াই করছে। এই মুহূর্তে যদি নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তবে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) কমিশনের কাছে সাত দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দাবি লিখিতভাবে জমা দিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের শিল্প খাতকে যদি এই সংকটে টিকিয়ে রাখা না যায়, তবে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে, নতুন বিনিয়োগ থমকে যাবে এবং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামবে।
আ.দৈ/আরএস




















