কড়া নিরাপত্তায় সচিবালয়: আসছে চৌকস পুলিশ ও এআই নজরদারি
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র এবং দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি এড়ানো, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা প্রতিরোধ এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই কঠোর পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে দর্শনার্থী প্রবেশ ও গাড়ি পার্কিং নীতিমালায় বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে মানুষের পাশাপাশি এবার যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি।
সম্প্রতি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে তদবিরকারীদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির সংস্কৃতির কারণে সচিব ও মন্ত্রীদের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সচিবালয়ে বিভিন্ন অনৈতিক অনুরোধ বা বদলি ঠেকানোর সুপারিশ নিয়ে যারা আসছেন, তাদের চিহ্নিত করে একটি 'তদবিরকারীদের তালিকা' তৈরি করছে দায়িত্বরত গোয়েন্দা সংস্থা।
একই সাথে সচিবালয়ের নিরাপত্তা বলয়কে নিশ্ছিদ্র করার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নিয়োজিত এবং বিভিন্ন অনিয়ম, গাফিলতি বা অদক্ষতার দায়ে চিহ্নিত অন্তত ১৬৯ জন পুলিশ সদস্যকে একযোগে বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ‘গানম্যান’ ও গেটের নিরাপত্তায় থাকা এই সদস্যদের তালিকা চূড়ান্ত করে ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। বদলির এই তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর অনেক পুলিশ সদস্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে বহাল থাকার জোর সুপারিশ পাঠাচ্ছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিব এ বিষয়ে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অবলম্বন করেছেন। মন্ত্রণালয় সূত্র সাফ জানিয়ে দিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশের সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে এক বিশেষ আদেশ জারির পর সচিবালয় থেকে পুরোনো ও বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয় এবং এরই মধ্যে বেশ কিছু সদস্যকে বদলিও করা হয়েছে। তাদের স্থলে শিগগিরই যুক্ত হচ্ছেন সম্পূর্ণ নতুন ও চৌকস পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া বিগত আওয়ামী শাসন আমলে সচিবালয়ে কর্মরত চিহ্নিত নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। পাশাপাশি পুরো সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের নিরাপত্তা তদারকির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ 'ভিজিল্যান্স টিম' গঠন করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় একই বাহিনী বা সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিপন্থী। কারণ দীর্ঘদিনের অবস্থানের ফলে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি হতে পারে, যা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শ— শুধুমাত্র সময়কাল বা ঢালাও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে, প্রতিটি সদস্যের সার্ভিস রেকর্ড, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যথায় দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, যা পেশাদারিত্বের জন্য ক্ষতিকর হবে।
আ. দৈ./কাশেম/ হেলাল




















