ঝুকিপুর্ণ হয়ে উঠছে বসবাস
ঢাকা যেন শব্দ দুষণের কারাগার বাড়ছে নীরব মৃত্যুঝুঁকি
শাহীন রহমান

সীমা ছাড়িয়ে বিষাক্ত শব্দ, ঘুমহীনতা-হৃদরোগ-মানসিক চাপে বিপর্যস্ত নগরজীবন
গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র, আইন আছে প্রয়োগ নেই
ঢাকায় শব্দ দূষণ বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নাগরিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ঢাকায় শব্দের গড় মাত্রা ১২০ ডেসিবেল। যা সহনীয় মাত্রার দ্বিগুণ। শুধু ঢাকা নয়, দেশজুড়েই শব্দের মাত্রা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ থাকছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে শুধু শ্রবণশক্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়াই নয়, ঝুঁকি বাড়ছে হৃদরোগেরও।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্যে ২০২২ সালে বিশ্বে শব্দ দূষণে শীর্ষে ছিল ঢাকা। যার গড় শব্দ মাত্রা ছিল ১১৯ ডেসিবেল। সম্প্রতি বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র জরিপে, ঢাকায় সর্বনিম্ন ৫৪ দশমিক ৮ ডেসিবেল ও সর্বোচ্চ ১২৭ দশমিক ৩০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
জাতীয় নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. মো. আবু হানিফ এ বিষয়ে বলেছেন, শব্দ দূষণের কারণে অনেকে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। এমনকি অনেক কিছু মনে রাখতে পারছে না, মাথা ব্যথা হয়। এছাড়া হার্টের সমস্যা হয়। এতে আস্তে আস্তে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে শবক্দ দুষণের কারণে ঢাকার বসবাস ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। হর্নের বিকট শব্দ, নির্মাণকাজের অবিরাম ড্রিল, উচ্চস্বরে মাইক আর যানজটের নগরজীবনে প্রতিদিন অদৃশ্য এক বিষের মধ্যে বসবাস করছেন রাজধানীবাসী। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় শব্দের মাত্রা সরকার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে। শিশুদের ঘুম ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ, শ্রবণক্ষমতা হ্রাস ও হৃদরোগের ঝুঁকি।
অথচ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রায় অনুপস্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা বলছে, রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকাও এখন তীব্র শব্দদূষণের কবলে। বিশেষজ্ঞরা একে “নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্সটিফিক রিপোর্ট এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার ৭০টি স্থানে শব্দ ও বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যানবাহন চলাচল বেশি এমন এলাকাগুলোতে শব্দের মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার বহু ওপরে। বিশেষ করে অফিস সময় ও রাতে শব্দের তীব্রতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছায়।
ঢাকার ২০টি এলাকায় পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ এলাকায় শব্দের মাত্রা ৭০ থেকে ৯৫ ডেসিবেলের মধ্যে ওঠানামা করে, যেখানে আবাসিক এলাকায় অনুমোদিত সীমা দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল। গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত হর্ন ও দীর্ঘ যানজটই এর প্রধান কারণ।
জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, “নীরব অঞ্চল” হিসেবে ঘোষিত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকাতেও শব্দমাত্রা বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করছে। এমনকি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বাইরের যানবাহনের শব্দ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ঢাকা এখন শব্দের কারাগার॥ পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দদূষণ এখন শুধু বিরক্তির বিষয় নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিবেশবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে থাকলে মানুষের শরীরে স্ট্রেস হরমোন বৃদ্ধি পায়। এতে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হৃদরোগ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। তাদের মনোযোগ কমে যায়, ঘুমের সমস্যা বাড়ে এবং মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, ঢাকায় শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও শব্দদূষণ মিলিয়ে এক ধরনের “ডাবল এনভায়রনমেন্টাল স্ট্রেস” তৈরি হয়েছে। ফলে শিশুদের মধ্যে খিটখিটে আচরণ, ঘুমহীনতা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণকে বাংলাদেশে এখনও “নীরব বিপদ” হিসেবেই দেখা হয়। বায়ুদূষণ বা জলবায়ু সংকটের মতো এটি নিয়ে জনসচেতনতা বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ততটা দৃশ্যমান নয়। অথচ প্রতিদিনের এই অতিরিক্ত শব্দ মানুষের কর্মক্ষমতা, শিক্ষার পরিবেশ এবং সামাজিক আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় নির্ধারিত সীমা ও নীরব অঞ্চল রক্ষার নির্দেশনা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে না।
গণপরিবহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার এবং নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে শব্দদূষণ বাংলাদেশের নগর জীবনে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক সংকট তৈরি করবে। এজন্য শুধু আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং নগর পরিকল্পনায় শব্দ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
আইন আছে, বাস্তবতা উল্টো॥ বাংলাদেশে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও নীরব অঞ্চলের জন্য পৃথক শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় হর্ন বাজানোও সীমিত করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় এসব আইন কার্যত অকার্যকর। ট্রাফিক সিগন্যালে অযথা হর্ন বাজানো, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সাউন্ডবক্সের অপব্যবহার এবং গভীর রাত পর্যন্ত নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি নেই।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনে “হর্ন নিষেধ” সাইনবোর্ড থাকলেও অবাধে হর্ন বাজছে। স্কুল এলাকার পাশেও ভারী যানবাহনের বিকট শব্দে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিঘ্নের মুখে পড়ছে। এটি ধীরে ধীরে জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণকে বাংলাদেশে এখনও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু আগেই শব্দকে গুরুতর পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের মতো শব্দদূষণও মানুষের আয়ু, মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। কিন্তু এ নিয়ে সচেতনতা কম, গবেষণা সীমিত এবং নীতিগত পদক্ষেপও দুর্বল।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা যেসব সুপারিশ করেছেন অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহারে কঠোর জরিমানার বিধান কার্যকর করতে হবে। হাসপাতাল ও স্কুল এলাকায় কার্যকর “সাইলেন্ট জোন” বাস্তবায়ন করা নির্মাণকাজে নির্ধারিত সময় ও শব্দনিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা; গণসচেতনতা বাড়ানো; নগর পরিকল্পনায় শব্দ ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করা; নিয়মিত শব্দমাত্রা পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ করা। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে “শব্দের নগরী” ঢাকা আগামী দিনে বড় ধরনের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















