আজিমপুর গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদেশ ফেরত ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি

আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এ সম্পর্কিত একটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে দেখছে। যাতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা পাঁচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন প্রকল্পের মোট ব্যায় ছিল ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। যা গণপূর্তের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রকল্প। আরো একটি প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে। আজিমপুরের এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল গণপূর্তের আজিমপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের সময়ে। দুর্নীতির শিরোমণি ইলিয়াস এখন সিলেটে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে। পদোন্নতি নিয়ে চলে গেলেও এই প্রকল্প এখনও চলে ইলিয়াসের হাতের ইশারায়।
ইলিয়াস ও ফয়সাল হালিম সিন্ডিকেট পিপিআর-২০০৮ এবং এর সংশোধিত বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পকেটস্থ করছে প্রকল্পের অনেক অর্থ। এই সিন্ডিকেটের দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সৎ ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তারা, যার ফলে আবাসন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। জানা গেছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘কালো ফান্ড’ তৈরি করা হয়েছে। এই ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম ধরা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ বর্তমানে সিলেটে বদলি হলেও ঢাকার আজিমপুর প্রকল্পের মূল ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখনো তার হাতেই। নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম কেবল তার আজ্ঞাবহ হিসেবে প্রতিটি ফাইলের কমিশন নিশ্চিত করছেন। এমনকি প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয় করে তা সিন্ডিকেটের পকেটে ভরা হয়েছে।
মাস্টাররোলে কর্মরত শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় গত এক মাসে দুজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ডেস্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
এই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আজিমপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সাথে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিদেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে আজিমপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে বদলি করা ছিল একটি পরিকল্পনার অংশ। যা বাস্তবায়ন করছেন ফয়সাল হালিম গংরা।
এই প্রকল্পের বেহাল অবস্থা সম্পর্কে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি দুদককে হস্তান্তর করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম জানান, "অনিয়ম নিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল আছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রকল্পের সকল ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট তলব করেছি। পিপিআর লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রমাণ মিললে সেই টেন্ডার বাতিল করা হবে।"
এদিকে অভিযোগকারীরা জানিয়েছে, নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার আগেই যেন ফয়সাল হালিম ও ইলিয়াস আহমেদ সিন্ডিকেটের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, কারণ তাদের মাধ্যমে অন্তত ৩০ কোটি টাকা পাঁচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজিমপুর আবাসন প্রকল্পের এই ‘হরিলুট’থামানো না গেলে তা কেবল একটি অবকাঠামোগত ব্যর্থতা হবে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের পথে একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
১০ শতাংশ ঘুষ সমাচার: ফয়সাল হালিম আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তার কমিশন ৫ শতাংশ থেকে এক লাফে ১০ শতাংশ করে ফেলেছেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারটি যেনো টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি এস্টিমেট তৈরিকালে একবার, টেন্ডারের এগ্রিমেন্টের সময়ে একবার এবং বিল পরিশোধকালে একবার-এভাবে তিনবার টাকা নিয়ে থাকে। আগের প্রকৌশলীরা যেখানে ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতো ফয়সাল হালিম তিন বারে তা ১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। যা আজিমপুর গণপূর্তে একটা নয়া রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
আ. দৈ./কাশেম




















