রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৩:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ৭৪)
X

বরিশালের কীর্তনখোলার তীরে একসময় দিন-রাত মেশিনের শব্দে মুখর থাকত এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী। ২০০২ সালে খানসন্স গ্রুপের অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসময় দেশের অন্যতম সফল সিমেন্ট কারখানা হিসেবে পরিচিত ছিল।

পাঁচটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বাজারে আস্থা অর্জন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু বর্তমানে সেই এ্যাংকর সিমেন্ট যেন দুর্নীতি, অর্থপাচার, ভ্যাট ফাঁকি, অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের এক ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে । তিন মাসের বেতন-বোনাস বকেয়া, উৎপাদন বন্ধ, শ্রমিক অসন্তোষ, কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে এখন প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

অভিযোগ রয়েছে, ঈদুল ফিতরের বেতন ও বোনাসসহ টানা তিন মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেনি কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত কাজের সম্মানীও বকেয়া পড়ে আছে। ঈদুল আজহা সামনে থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা নিয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করলে বন্ধ হয়ে যায় ফ্যাক্টরীর স্বাভাবিক কার্যক্রম। বর্তমানে সিমেন্ট উৎপাদন প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে কাঁচামাল ও ভ্যাট ফাঁকি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্টক রেজিস্টারে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ক্লিংকার দেখানো হলেও বাস্তবে সেই ক্লিংকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ্যাংকর সিমেন্টের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই ৮০ হাজার মেট্রিক টন ক্লিংকার দিয়ে প্রায় ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ৬৬৭ ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়েছে। পরে ডুপ্লিকেট মূসক চালানের মাধ্যমে বাজারজাত করে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে। তার দাবি, শুধু ক্লিংকার থেকেই প্রায় ২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হয়েছে।

এছাড়া লাইমস্টোন, জিপসাম, স্লাগ ও ফ্লাই অ্যাশের হিসাব গোপন করে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে বরিশাল কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট সাজ্জাদুল আলম বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। সূত্রের দাবি, ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রতি মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করা হচ্ছে।

গত ১ মে মহান মে দিবসে শ্রমিকদের প্রতি অটুট শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ। অথচ মে মাসেও শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না হওয়ায় ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নেয়। গত ১০ মে বিকেলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ফ্যাক্টরীতে সিওও শাহেদ উদ্দিনকে ধাওয়া দিলে তিনি দৌড়ে একটি অফিস কক্ষে আশ্রয় নেন। পরে শ্রমিকরা অফিসে তালা দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হস্তক্ষেপ করে। পরে শাহেদ উদ্দিন আগামী ২০ মে’র মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধের মুচলেকা দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বেতন-ভাতা আদায়ের আন্দোলন করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। অন্যদিকে অলিম্পিক ফাইবার লিমিটেডের ব্যাগ ফ্যাক্টরী গত ২০ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে। প্রথমে ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ২০ মে পর্যন্ত করা হয়। দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে কাজ করা অনেক নারী শ্রমিক তাদের পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। বর্তমানে ব্যাগ ফ্যাক্টরী ও এ্যাংকর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী—দুই ইউনিটই প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে।

অপরদিকে ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সিমেন্টের অগ্রিম বিল পরিশোধ করা ডিলার, রিটেইলার ও করপোরেট ক্রেতারা। অভিযোগ রয়েছে, সিএমও ইমাম ফারুকী ক্রেতাদের সিমেন্ট দিতে ব্যর্থ হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

আরও অভিযোগ উঠেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস নিলুফা ইয়াসমিন নিলা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে অধিকাংশ ডিলারকে বঞ্চিত করে তার ভাই রাসেলকে এককভাবে সিমেন্ট সরবরাহে সুবিধা দিয়েছেন। ফলে ক্ষুব্ধ ডিলার ও রিটেইলাররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এ্যাংকর সিমেন্ট থেকে। বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ভয়াবহভাবে ধসে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

একসময় সঠিক ওজন, উন্নত মান ও দ্রুত সরবরাহের কারণে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছিল এ্যাংকর সিমেন্ট। কিন্তু এখন অভিযোগ উঠেছে, উৎপাদনে প্রধান উপাদান ক্লিংকার কমিয়ে অতিরিক্ত ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া লাইমস্টোন, স্লাগ ও জিপসামের পরিমাণও কমিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সিমেন্টের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব লোপাট, বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংক ঋণের বোঝা, শ্রমিকের কান্না আর ক্রেতাদের প্রতারণার দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

আ. দৈ./কাশেম/ ইমু



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝