স্বস্তি ফিরছে পুঁজিবাজারে
দুই সপ্তাহ পর হাজার কোটি টাকার ঘরে লেনদেন
বিশেষ প্রতিনিধি

টানা দরপতন, বিনিয়োগকারীদের হতাশা আর আস্থার সংকটের মধ্যেই দেশের পুঁজিবাজারে দেখা দিয়েছে স্বস্তির আভাস। প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দৈনিক লেনদেন আবারও হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর এই উল্লম্ফন শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। মঙ্গলবার দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১১০১ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ২২৯ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট। আগের দিন সামান্য পতন শেষে সূচক ছিল ৫ হাজার ২০৫ পয়েন্ট। সেদিন এ বাজারে লেনদেন হয় ৭১৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার।
এর আগে সবশেষ গত ২৮ এপ্রিল ডিএসইতে হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। সেদিন হাতবদল হয় এক হাজার ২৬ কোটি টাকার শেয়ার। আর মাঝের দিনগুলোতে লেনদেন ৭০০ থেকে ৮৭৬ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ১৫, ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি ১২০০ কোটি টাকার বেশি করে লেনদেন হয়। এরপর ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকার ঘর স্পর্শ করেনি। মাঝে ৮ এপ্রিল ৯৯২ কোটি টাকার লেনদেন করে।
মঙ্গলবার লেনদেনের শুরুর আধাঘণ্টায় সূচকে তেজিভাব দেখা গেলেও পরেরে আধা ঘণ্টায় তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২২৫ পয়েন্টে। এসময় রাজধানীর একটি হোটেলে ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির (বিএসআইসি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা ক্যাপিটাল মার্কেট রিফর্মে যাচ্ছি। বড় ধরনের সংস্কার হবে। আমরা বিগওয়েতে সিরিয়াস রেগুলেশনে যাচ্ছি।” এদিন শেষে লেনদেন ছাড়িয়ে যায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার উপরে। এর মধ্যে ব্লক মার্কেটে লেনদেন হয় ৩৭২ কোটি টাকার। ডিএসইতে মোট ৩৯৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৮৮টির, কমে ১৩৮টির এবং আগের দরে লেনদেন করে ৬৭টির। প্রকৌশল, ওষুধ ও রসায়ন খাত, বস্ত্র, বীমা ও ব্যাংক খাতের শেয়ারের হাতবদল হয় সর্বোচ্চ।
ক্লোজিং প্রাইস বিবেচনায় ডিএসইতে সর্বোচ্চ শেয়ার দর বাড়ে রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টসের। আগের দিনের চেয়ে দর বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ; সবশেষ শেয়ার হাতবদল হয় ২৪ টাকা ৩০ পয়সায়। দরবৃদ্ধিতে এর পরের অবস্থানে আসে ইসলামী কমার্শিয়াল; আর তৃতীয় অবস্থানে ছিল ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটড আর ক্লোজিং প্রাইস বিবেচনায় শেয়ার দর হারানোর শীর্ষে চলে আসে মেঘনা পিইটি, মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমছিল। বেশিরভাগ দিনই ডিএসইতে লেনদেন ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বাজারে সক্রিয় বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী লোকসানের আশঙ্কায় বাজার থেকে দূরে সরে যান। বড় বিনিয়োগকারীরাও অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নেন। এমন পরিস্থিতিতে আবারও হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি বড় কারণ একসঙ্গে কাজ করায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কিছু বড় মূলধনী শেয়ারের দরবৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শেয়ারে নতুন আগ্রহ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আংশিক প্রত্যাবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু ইতিবাচক বার্তা। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিতও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিনের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অংশ নেয় ব্যাংক, ওষুধ, জ্বালানি ও বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার। বিশেষ করে কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারে ক্রয়চাপ বাড়তে দেখা যায়। এতে বাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়। বাজারে সক্রিয় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের আচরণে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে যেখানে বিনিয়োগকারীরা প্রতিটি দরপতনে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছিলেন, এখন সেখানে অনেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা বলেন, “বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে যে নেতিবাচক মনোভাব ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন বুঝতে পারছেন যে অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার অস্বাভাবিক কম দামে চলে গিয়েছিল। ফলে এখন সেগুলোতে ক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু একদিন বা কয়েকদিনের লেনদেন বৃদ্ধি দিয়ে পুরো বাজারের স্থায়ী উন্নতির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ দেশের পুঁজিবাজার এখনো বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদের হার, ডলারের চাপ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
গত এক বছরে দেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আস্থার সংকট। বহু বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন, বাজারে কারসাজি ও দুর্বল তদারকির কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো ও পরে ধস নামানোর ঘটনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে পুরো বাজারে। নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, লেনদেনও ক্রমাগত কমতে থাকে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, “বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বিশ্বাসের সংকট। বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন বাজার নিরাপদ নয়, তাহলে সাময়িকভাবে লেনদেন বাড়লেও তা স্থায়ী হবে না। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।” তিনি বলেন, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত না হলে বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে ফিরে আসবেন না। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের মানও উন্নত করতে হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কমিশন বিভিন্ন কোম্পানির অনিয়ম তদন্ত, কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন নীতিগত সহায়তার কথাও আলোচনা হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাজারে অধিকাংশ লেনদেনই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। ফলে গুজব বা আতঙ্ক দ্রুত বাজারে প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে বড় বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ড সক্রিয় থাকলে বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয় নিয়ে কিছু ইতিবাচক তথ্য বাজারে আশাবাদ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে যাওয়াও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে।
তবে বাজারে এখনো কিছু বড় ঝুঁকি রয়ে গেছে। উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংক আমানতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। এতে অনেকেই শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে ব্যাংকে রাখছেন। অন্যদিকে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি করতে এখনো সময় লাগতে পারে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বলছেন, বাজারে আস্থা ফিরলেও তারা এখনো সতর্ক। রাজধানীর মতিঝিলের এক বিনিয়োগকারী বলেন, “গত কয়েক বছরে আমরা অনেক ক্ষতি দেখেছি। তাই এখন বাজার একটু বাড়লেই অনেকে দ্রুত লাভ তুলে নিচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। যদি কয়েকদিন ধরে লেনদেন বাড়তে থাকে এবং সূচক স্থিতিশীল থাকে, তাহলে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা বিনিয়োগকারীরা আবার সক্রিয় হতে পারেন।
একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকেও পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ আসে পুঁজিবাজার থেকে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা তৈরি করতে হলে বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুঁজিবাজারে স্থায়ী উন্নতির জন্য শুধু লেনদেন বাড়লেই হবে না; ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে গুজব ও কৃত্রিম দরবৃদ্ধি বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। দুই সপ্তাহ পর লেনদেন আবার হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোয় বাজারে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে। ব্রোকারেজ হাউসগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে। অনেকেই এটিকে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
তবে সামনে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে না পারলে আবারও বাজারে হতাশা ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এখন পুরো বাজারের নজর আগামী কয়েকটি কার্যদিবসের দিকে। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা—সাময়িক উত্থান নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ একটি পুঁজিবাজার ফিরে আসুক, যেখানে বিনিয়োগ হবে নিরাপদ, আর আস্থা হবে টেকসই।
আ.দৈ/আরএস




















