ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই বড় ভূমিকম্পের ঝুকিতে দেশ
ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে
শাহীন রহমান

পরপর দু’দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভভুত হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি না হলেও মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবছর একাধিকবার ভূমিকম্পের কেপে উঠছে দেশ। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দেশে ভূমিকম্প ঝুকি কতটা। তবে সব বিশেষজ্ঞই বলছেন দেশে ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভুমিকম্প ঝুকিতে রয়েছে দেশ।
দেশের প্রখ্যাত ভূমিকম্প বিশারদ সৈয়দ হুমায়ুন আকতার বলেন, তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ স্থলে দেশের অবস্থান। বিশ্বের বড় বড় ভুমিকম্প টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে উৎপত্তি। এই হিসাবে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুকির মধ্যে রয়েছে। অতীতে এসব প্লেট থেকে বড় ভুমিকম্পের রেকর্ড হয়েছে।
বর্তমানে এসব প্লেট বাউন্ডারিতে প্রচুর শক্তি জমা হয়ে আছে। এ কারণে ঝুকি বাড়ছে। তবে ভুমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে প্রস্তুতি নেয়ার কথা জানান তিনি। বলেন প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি বা মৃত্যু অর্ধেক এড়ানো সম্ভব হবে।
গত রোববার দিবাগত গভীর রাতে আঘাত হানে মাঝারি মাত্রার একটি ভূমিকম্প, যার কম্পন চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় অনুভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ১টা ৩৬ মিনিটে ভূমিকম্পটি সংঘটিত হয়।
জার্মান ভূবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ০। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার খবরে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলের একটি এলাকায় শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রের অবস্থান ছিল ২০ দশমিক ৪৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯৩ দশমিক ৯৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে।
অন্যদিকে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, মিয়ানমারের সিদোকতাইয়া শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে ছিল ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগের দিনও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
শনিবার বিকেলে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন টের পান স্থানীয়রা। বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে অনুভূত ওই ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি।
দেশি-বিদেশি গবেষণা, দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদদের দীর্ঘদিনের সতর্কবার্তা বলছে, বাংলাদেশ বিশেষ করে ঢাকা একটি উচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্যোগগুলোর একটিতে রূপ নিতে পারে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের নিচে ও আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্টলাইন বা ভূত্বকের ফাটল অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে ভূত্বকের ভেতরে চাপ জমা হচ্ছে। সেই চাপ হঠাৎ ভেঙে বেরিয়ে এলে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলো ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতারই ইঙ্গিত।
ভূতত্ত্ববিদদের ব্যাখ্যায়, বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের প্রভাবাধীন অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বে ডাউকি ফল্ট, মধ্যাঞ্চলে মধুপুর ফল্ট এবং দক্ষিণ-পূর্বে চট্টগ্রাম-আরাকান সাবডাকশন জোন দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। এসব অঞ্চলে অতীতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা শুধু ভূমিকম্পের সম্ভাবনায় নয়; সমস্যা হলো দেশের প্রস্তুতিহীনতায়।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ঢাকাকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরীতে কোটি কোটি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছে। রাজধানীর বহু ভবন নির্মাণ হয়েছে যথাযথ প্রকৌশল নকশা ও বিল্ডিং কোড না মেনে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বড় ভূমিকম্প হলে ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ এবং উদ্ধার সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি।
সরু রাস্তা, ঘনবসতি, পুরোনো ভবন এবং রাসায়নিক গুদামের উপস্থিতি সম্ভাব্য বিপর্যয়কে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে। ভূমিকম্পের পর যদি আগুন লাগে, তাহলে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী যানবাহনের দ্রুত প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু পুরান ঢাকা নয়, নতুন নগরায়িত এলাকাগুলো নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিচু জমি ও জলাভূমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় “লিকুইফ্যাকশন” বা ভূমিকম্পের সময় মাটি তরলের মতো আচরণ করার ঝুঁকি থাকে। এতে ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে ভবন হেলে পড়া বা ধসে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষ করে উত্তরা, পূর্বাচল ও আশপাশের কিছু এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো “অপ্রস্তুত নগর সভ্যতা”। তারা বলছেন, উন্নত অনেক দেশও ভূমিকম্প ঠেকাতে পারে না, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে শক্তিশালী বিল্ডিং কোড, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির মাধ্যমে। বাংলাদেশে এখনো সেই প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। রাজধানীর বহু বহুতল ভবনের প্রকৃত কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক ভবনে অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা যোগ করা হয়েছে। কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ভূমিকম্পের সময় শুধু ভবনধসই নয়, পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ঢাকার অনেক এলাকায় রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ যে ভারী উদ্ধারযন্ত্র প্রবেশ করা কঠিন হবে। আবার হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ এলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ঘন ঘন ভূমিকম্পকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে ছোট ছোট ভূমিকম্প হলে বড় ভূমিকম্পের শক্তি বেরিয়ে যায়। কিন্তু ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। অনেক সময় ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাসও হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন বড় ভূমিকম্প না হওয়া মানে ভূগর্ভে শক্তি জমতে থাকা। ফলে ভবিষ্যতে বড় মাত্রার কম্পনের ঝুঁকি উল্টো বেড়ে যেতে পারে।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন যৌথ গবেষণায় দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বহু এলাকা উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অঞ্চলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে আরও কঠোর প্রকৌশল মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় ভূমিকম্প হলে শুধু প্রাণহানিই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংকিং, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা খেতে পারে। রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে ঢাকায় বড় দুর্যোগের প্রভাব পুরো দেশেই পড়বে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো “প্রস্তুতির সংস্কৃতি” তৈরি করা। স্কুল, কলেজ, অফিস ও আবাসিক ভবনে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, পুরোনো ভবনের কাঠামোগত পরীক্ষা এবং নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক ভূমিকম্প সহনশীল নকশা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বড় ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পর্যাপ্ত উদ্ধারযন্ত্র, প্রশিক্ষিত জনবল ও সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনা ছাড়া বিপুলসংখ্যক মানুষকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
জনসচেতনতার ঘাটতিকেও বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। অনেক মানুষ এখনো জানেন না ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে। আতঙ্কে সিঁড়িতে ভিড় করা, লিফট ব্যবহার করা বা ভবন থেকে লাফ দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে “ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড” পদ্ধতি শেখাতে হবে—অর্থাৎ কম্পনের সময় নিচু হয়ে মজবুত টেবিল বা কাঠামোর নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং মাথা সুরক্ষিত রাখা।
ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়—এ কথা সবাই জানেন। কিন্তু গবেষকদের মতে, প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। জাপান, চিলি বা তুরস্কের উদাহরণ তুলে তারা বলছেন, শক্তিশালী বিল্ডিং কোড, নগর পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা প্রাণহানি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে এখনো সেই পর্যায়ের প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ভূমিকম্পের ঝুঁকি “ভবিষ্যতের” কোনো বিষয় নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। সাম্প্রতিক ঘন ঘন কম্পন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দেশের বড় শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা কতটা ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। গবেষকদের সতর্কবার্তা—এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কোনো বড় ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগই হবে না, বরং তা জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।'
আ.দৈ/আরএস




















