সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রেমিটেন্সে ঘুরছে অর্থনীতির চাকা
প্রবাসীদের পাঠানো ডলারে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বিশেষ প্রতিনিধি॥
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৮:৫১ পিএম   (ভিজিট : ৩৭)
X

চলতি মে মাসের প্রথম ৯ দিনেই ১ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১০২ কোটি ৯০ লাখ বা ১ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা প্রায় (ডলার প্রতি ১২২.৭৫ টাকা হিসাবে)। প্রবাসী আয়ের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আরেকবার সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করতে পারে চলতি মে মাস।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন দেশের অর্থনীতিতে আবারও স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে রেমিটেন্স প্রবাহ। কয়েক মাস ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে প্রবাসী আয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বেশি অর্থ পাঠানোয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে ডলারের বাজারে চাপ কিছুটা কমেছে, আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হচ্ছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতেও ফিরে আসছে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত।

সাধারণত ঈদ-রোজার মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। গত মার্চ মাসের ২০ তারিখ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হয়। সে মাসে প্রবাসীরা দেশে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এটিই প্রথম ও একমাত্র সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় অতিক্রমকারী মাস। চলতি মাসের ২৭ মে (চাঁদ দেখা সাপেক্ষে) পবিত্র ঈদুল আযহা অনুষ্ঠিত হবে। এ মাসের প্রথম ৯ দিনে প্রবাসীরা প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ডলার করে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন; যা গত মাসের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে মাস শেষে আবারও সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করবে প্রবাসী আয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একক মাস হিসাবে ছয় বার ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে। গত বছরের মার্চ মাসে দেশে প্রথমবারের মতো বৈধ পথে ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন বা ৩২৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। পরবর্তীতে গত ডিসেম্বরে আসে ৩২২ কোটি ডলার। এরপর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম মাস তথা জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি, মার্চে ৩৭৫ কোটি ও এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রবাসী আয় আসে দেশে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৩০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে দেশে। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৫ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। রেমিট্যান্সের এ প্রবাহের উপর ভিত্তি করে দেশের রিজার্ভের ভিতও মজবুত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের বর্তমান গ্রস রিজার্ভ (১০ মে পর্যন্ত) ৩৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাবপদ্ধতি (বিপিএম৬) অনুযায়ী এটি ২৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থে বড় উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা, হুন্ডি দমনে নজরদারি এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত হওয়ার কারণে প্রবাসীরা এখন আনুষ্ঠানিক পথে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন।

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রেমিটেন্স দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রিজার্ভ কমে যাওয়ার যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা মোকাবিলায় রেমিটেন্স এখন “লাইফলাইন” হিসেবে কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের বড় অংশ এখন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে আসছে। এতে অর্থ পাঠানো সহজ হয়েছে, সময় কমেছে এবং অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চক্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। ব্যাংকাররা বলছেন, সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু প্রণোদনাই নয়, ডলারের বাজারে পরিবর্তনও রেমিটেন্স বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগে খোলা বাজারে ডলারের দাম বেশি থাকায় অনেক প্রবাসী হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতেন। এখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দর দেওয়ায় বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিটেন্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় না; দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকেও সচল রাখে। প্রবাসী পরিবারের ব্যয় বাড়লে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয় হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে বাড়িঘর নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ছোট ব্যবসায় রেমিটেন্সের অর্থ বড় ভূমিকা রাখে। সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মুন্সীগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা বেশি। এসব এলাকায় রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি ফিরে আসে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামে জমি কেনাবেচা, বাড়ি নির্মাণ ও ভোগব্যয় বেড়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্কও করছেন। তাদের মতে, শুধু রেমিটেন্স বাড়লেই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। কারণ বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনও মূলত স্বল্পদক্ষ কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ খাত ও স্বল্প মজুরির চাকরিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে রেমিটেন্স বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে, কী ধরনের শ্রমশক্তি বিদেশে যাচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি না বাড়ালে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।”

বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া ও ওমানে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স বাড়াতে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউস সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুন্ডি চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে এখনও নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক প্রবাসী বলছেন, বিদেশে ব্যাংকিং সেবা জটিল হওয়ায় তারা অনানুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠাতে বাধ্য হন। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দেশে টাকা তুলতে গিয়ে হয়রানি ও অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয়।

সৌদি আরবে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, আগে হুন্ডিতে টাকা পাঠালে পরিবার দ্রুত পেত। এখন ব্যাংকেও সুবিধা বেড়েছে, কিন্তু সব জায়গায় এখনও সহজ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়লেও তা ধরে রাখতে হলে প্রবাসীবান্ধব নীতি জরুরি। বিমানবন্দর হয়রানি কমানো, কম খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ শ্রমবাজার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক বলেন, প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠান না, দেশের অর্থনীতির সংকটে বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেন। তাই তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।” রেমিটেন্স বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে ডলারের বাজারেও দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ডলার সংকট কিছুটা কমেছে, এলসি খোলা সহজ হচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধে চাপ কমছে। যদিও বৈদেশিক ঋণ ও আমদানি দায় এখনও বড় চ্যালেঞ্জ, তবু রেমিটেন্সের ধারাবাহিক প্রবাহ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রবাসী আয় বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর আস্থা বাড়বে এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেও সহায়ক হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে প্রবাসী শ্রমবাজার, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর। এর মধ্যে রেমিটেন্সই এখন সবচেয়ে দ্রুত স্বস্তি দিচ্ছে।

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়েও প্রবাসীরা তাদের পরিবার ও দেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন—এটাই বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই এখন প্রবাসী আয়ের ছাপ স্পষ্ট। নতুন বাড়ি, সন্তানের উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, ছোট ব্যবসা কিংবা সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে প্রবাসীদের ঘামঝরা আয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবাহ শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি পরিবারের জীবিকার গল্প, টিকে থাকার গল্প এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার এক নীরব শক্তির গল্প।

আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝