শিল্পপ্রতিষ্ঠায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে,তবে আর্থিক ঝুঁকির শঙ্কায় ব্যাংকগুলো
বন্ধ শিল্প সচলে ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগ সরকারের
বিশেষ প্রতিনিধি ॥

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। স্বল্পমেয়াদি রিফাইন্যান্স স্কিমের মাধ্যমে এই অর্থায়ন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা দ্রুতই চূড়ান্ত করে সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ হয়ে থাকা বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এমন আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার ঘোষিত কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বন্ধ কারখানাগুলোর অবস্থা অনুযায়ী তিন ধরনের অর্থায়ন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। যেসব কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে কিন্তু মূলধনের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত, তাদের দ্রুত সহায়তা দেয়া হবে। আর যেসব কারখানা পুরোপুরি অচল, তাদের পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এই তহবিল বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি-সংকোচন মনোভাব।
ব্যাংকাররা বলছেন, অতীতে দেয়া ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থায়নে তারা সতর্ক। তাদের দাবি, এই ঋণ যদি পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতি পোষাতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ক্রেডিট গ্যারান্টি থাকতে হবে। পাশাপাশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, বিগত সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থপাচারের কারণে আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে নিজস্ব তহবিল থেকে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া এখন অনেক ব্যাংকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া করোনাকালে দেয়া প্রণোদনা ঋণের একটি বড় অংশ এখনও আদায় না হওয়ায় নতুন ঝুঁকি নিতে অনীহা রয়েছে ব্যাংকগুলোর মধ্যে। ইতোমধ্যে বন্ধ কারখানার তালিকা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে, যা এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করতে এ ধরনের তহবিল গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এটি নতুন করে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিজনেস ও ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সঙ্গে মতবিনিময়সভা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন। সেখানে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানা গেছে। সভায় বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল করতে দ্রুত ও কার্যকর অর্থায়নের ওপর জোর দেয়া হয়। তবে এই অর্থায়নের উৎস হিসেবে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, নাকি বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কোন পক্ষ কিভাবে অংশ নেবে, তা নির্ধারণে এখনো কাজ চলছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক আছে, শুধু ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না, তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের বকেয়ার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং ক্রেতা (বায়ার) নেই, তাদের জন্য মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন দেয়া হবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং নতুন করে যন্ত্রপাতি স্থাপন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে। তবে ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে অর্থায়ন বাস্তবায়নের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে।
বন্ধ কারখানা সচল করতে দেওয়া ঋণ যদি পুনরায় খেলাপি বা ‘খারাপ ঋণে’ পরিণত হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো যেন তার ক্ষতিপূরণ পায়, সে জন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি চাওয়া হয়েছে; নতুন করে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিরাপত্তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি জামানত নিশ্চিত করা এবং কারখানাগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা তদারক করতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরামর্শক নিয়োগের সুযোগ চাওয়া হয়েছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় দুই ডজন ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে এবং এসব অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে এই খাতে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা সীমিত। তাই জরুরি তহবিল সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই সরবরাহ করা প্রয়োজন। যদিও এসব অর্থ বিতরণ করবে ব্যাংকগুলোই। এ কারণে তারা ক্রেডিট গ্যারান্টি চাইছে।
জানা গেছে, বন্ধ কলকারখানা সচল করতে গত ২৬ এপ্রিল ১৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিভাবে অর্থায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সভা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সভায় বন্ধ কারখানা সচল করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
গত ২৫ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সভার পর তিনি বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু করতে শিগগিরই একটি প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ব্যাংকের কাছ থেকে বন্ধ কারখানার তালিকা সংগ্রহ করছি। কারণ আমরা দেখতে চাই, কারখানাগুলো ঠিক কী কারণে বন্ধ হয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে সরকারের সঙ্গে বসব। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কী ধরনের সুবিধা দিলে কারখানাগুলো আবার চালু করা যায়। এক মাসের মধ্যেই এই উদ্যোগ সামনে আসবে।’
আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান




















