রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি সংকটে পরিবহন ও শিল্প খাত
আবুল কাশেম:
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ৪:৪০ পিএম   (ভিজিট : ৬১)
X


ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর সন্ত্রাসী ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্টের বিমান হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছাড়য়ে পড়েছে যুদ্ধ। একই ইরান নিয়ন্ত্রীত হরমুজ প্রনালী হয়ে জ্বালানী বহনকারী জাহাজ আটকে যাচ্ছে ওই পথে। তবে ইরানের সমর্থিত দেশগুলোর জন্য বহনকারী জ্বালানী বোঝাই জাহাজ স্বস্ব দেশে যাবার অনুমতি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তীব্র জ্বালানী সংকট শুরু হয়েছে। এর বিরোপ প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।

বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পেট্রোল পাম্পগুলো জ্বালানীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনসহ মালামাল পরিবহনের সাথে জড়িত কন্টেইনারগুলোকে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্বালানী সংগ্রহ করতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এরপরও চাহিদা মোতাবেক জ্বালানী সংগ্রহ করতে পারছেন  না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,দেশে জ্বালানি সরবরাহে সংকট কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও বিপণনেও সমস্যা হয়।এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্যতেল, ওষুধ, সার এবং কৃষি সম্পর্কিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, জ্বালানি সংকটের সময় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।

দেশেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বেশি পরিমাণে তেল কিনতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জমছে ভিড়। এ অবস্থায় গত ৬ মার্চ ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।ফলে অনেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। আবার বেঁধে দেওয়া পরিমাণ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে চলে যাচ্ছে অনেকটা সময়। যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না, আর পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি আনতেও অনেক সময় লাগছে। শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি,এমনটাই তারা বলছেন।

দেশের অন্যতম বৃহৎ পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়; এটি মূলত একটি বৈশ্বিক সংকটের অংশ। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে এ পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং উৎপাদনশীল শিল্পখাতে যাতে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।বিশ্বজিৎ সাহা আরও বলেন, এর আগেও বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ,সব ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে পারে। তাই এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মত দেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বর্তমানে তেল সংকট আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন গন্তব্যে বিতরণের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত জ্বালানি অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে তেলের স্বল্পতার কারণে পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমকে বলেন, চলমান তেল সংকট দেশের গার্মেন্টস শিল্পের কার্যক্রমে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। অনেক কারখানা মালিক জানিয়েছেন, জেনারেটর পরিচালনা এবং পণ্য পরিবহনের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, তা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে—কোথাও উৎপাদন ধীরগতিতে চলছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বিকেএমইএর সভাপতির মতে, গার্মেন্টস শিল্প দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই এ খাতের কার্যক্রম সচল রাখা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, কারখানা শ্রমিকরা পাঁচ থেকে ছয় দিনের ছুটিতে চলে যাবেন। ১৭ মার্চ থেকে এ সমস্যাটা চলে যাবে। ইন্ডাস্ট্রি যেন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে সেজন্য অবশ্যই চাহিদা মতো ফুয়েল সাপ্লাই দিতে হবে। কারখানা মালিকরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানায় যদি কাজ করতে না পারে তাহলে শ্রমিকদের বেতন দেবে কীভাবে? এজন্য অবশ্যই এখাতে নজর দেওয়া উচিত।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রপ্তানি বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। জ্বালানি সংকটের কারণে যদি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে উৎপাদন কমে যাবে, কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং রপ্তানি আয়ও কমে যেতে পারে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই শিল্প খাতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এবং অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 এছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব।

শিল্পের মালিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতি ও বাজার,উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

আ. দৈ./কাশেম



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝