১৭ মাসে ৬০০ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৫৮ ও আহত ৭০৮২
সচিবালয়ে সৃষ্ট মব সারাদেশে ছড়িয়েছে,জাতীয় নির্বাচনে পড়বে প্রভাব: টিআইবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :

ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্থীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে সৃষ্ট ‘মব’ ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের। একই সাথে সচিবালয়ে সৃষ্ট ‘মব’ দ্রুত শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ এই ‘মব’ সন্ত্রাস আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ের কনফারেন্স কক্ষে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বাংলাদেশে মবের বিষয়টি শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকে। সরকার পরিচালনার কেন্দ্রস্থল সচিবালয়, সেখানে থেকে কিন্তু মবের উৎপত্তি। সরকার মবকে ক্ষমতায়িত করেছে। মবের কারণে সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ না করলে মব নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।’
সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে চায়। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত আমরা যে ন্যারেটিভ তাদের কাছ থেকে শুনেছি যে, সরকারের হাত-পা বেঁধে দেবেন না। জনগণের কাছে জবাবদিহি, সরকার ব্যবস্থার জন্য চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স উপস্থাপনা করা হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের আপত্তি ছিল।’
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিচার, সংস্কার, নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও অংশীজনের ভূমিকা নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত গবেষণা চালায় টিআইবি। যেখানে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, জুলাই যোদ্ধাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ, রাষ্ট্র সংস্কারসহ ১৮টি পদক্ষেপের অগ্রগতি-ঘাটতি ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।
মবের পরিসংখ্যান :
টিআইবির প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারাদেশে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৭ হাজার ৮২ জন।
এসব সহিংসতার মধ্যে ৫৫০টিতে (৯১.৭ শতাংশ) বিএনপি সম্পৃক্ত। ১২৪টিতে অর্থাৎ ২০.৭ শতাংশ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, ৭.৭ শতাংশ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী এবং ১.২ শতাংশ ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্পৃক্ততা রয়েছে।
টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদনে আরও জানায়, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের দখলে থাকা প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও সংঘাত- পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি; সিলেটের কোয়ারি ও নদ-নদী থেকে পাথর লুটপাট; সেতু, বাজার, ঘাট, বালু মহাল ও জল মহাল ইত্যাদি ইজারা নিয়ন্ত্রণ; এসব ক্ষেত্রে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি দলগুলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনের মধ্যেই দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বড় ঘাটতি রয়েছে।
২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার হুমকিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আ. দৈ./কাশেম




















