সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত ‘আত্মঘাতী’: বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্তকে পোশাক শিল্পের জন্য চরম ‘বিপর্যয়কর’ ও ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে দেশের পোশাকখাতের প্রধান দুটি সংগঠন, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
আজ সোমবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠন দুটি এই একতরফা সিদ্ধান্ত বাতিলের জোর দাবি জানায়।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, “বিশ্ববাজারের মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করার অর্থ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে জেনেশুনে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।”
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘পোশাক খাত এখন আইসিইউ’তে আছে। পাটের পর এখন পোশাকশিল্প ধ্বংস হবে।’
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় যে, আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী আমদানিতে শুল্কারোপের আগে স্থানীয় শিল্পে ক্ষতির প্রমাণ দিতে হয়, যা এক্ষেত্রে মানা হয়নি এবং এটি সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির লঙ্ঘন। পোশাক রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকা বেশি দাম দাবি করছে, যা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয়, নিট পোশাক খাত থেকে বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে, যা এখন এই সিদ্ধান্তের কারণে ঝুঁকির মুখে। দেশীয় মিলগুলো উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সুতা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির পথ রুদ্ধ হলে উৎপাদন শিডিউল তছনছ হয়ে যাবে। পোশাক খাতের নেতারা স্পষ্ট জানান, তারা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিরোধী নন, তবে সেই সুরক্ষা আমদানিতে বাধা দিয়ে নয় বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষায় সুতা আমদানিতেতে শুল্কারোপের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত অবিলম্বের প্রত্যাহার করার জন্য সরকারকে জোর অনুরোধ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বায়াররা এটাকে খুব বেশি ভালোভানে নেননি, তারাও ভীত। সবচেয়ে বড় যে বায়ার, তিনি মেসেজের পর মেসেজ করছেন। তারা বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং করেন। দেশের ভেতের তাদের নমিনেটেড স্পিনিং মিল আছে, দেশের বাইরেও আছে। দেশের বাইরে যে নমিনেটেড স্পিনিং মিলগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে তারা চিন্তিত।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, পার্শ্ববর্তী কোনো দেশ বাংলাদেশে সুতা ডাম্পিং করলে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বিধান মেনে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করা যেতে পারে। সেটি না করে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করায় পুরো গার্মেন্টস খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে বিদেশি ক্রেতারা এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন। তাছাড়া বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো উচ্চমান ও মূল্যের সুতাও উৎপাদন করতে পারে না। তাহলে এ ধরনের পোশাক রপ্তানি আদেশও পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে তৈরি পোশাক খাতে যত প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তার পুরোটাই ভোগ করেছে টেক্সটাইল খাত। তারপরও তাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলো না কেন?
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি আরও বলেন, বেনাপোল পোর্ট বন্ধ করায় দেশের কী লাভ হয়েছে সরকারকে সবার সেই প্রশ্ন রাখতে হবে। দেশের কী লাভ হয়েছে সরকারকে তা জানাতে হবে।
তিনি বলেন, ভারত যেমন অ্যান্টি ডাম্পিং দেয় প্রয়োজনে ভারতীয় সুতার ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং দেন। এই পথে না গিয়ে তারা আমাদের হাত-পা বাধার জন্য এই পথে গেছে। স্পিনিং মিলগুলো নেই, এটি যদি সঠিক হয়- তবে আমরাও তো কেউ ভালো নেই। আমরা আইসিইউ’র মধ্যে আছি। তার মানে আরেকজন বাঁচতে পারবে না তা নয়। যার যার রাস্তা তাকেই ঠিক করতে হবে। ওনাদের বাঁচতে ওনাদের পলিসি তৈরি করতে হবে। ওনাদের একমাত্র বায়ার আমরা।
শামীম এহসান বলেন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া সুতা রপ্তানি করে। বাংলাদেশ কেন সুতা রপ্তানি করতে পারে না? এক্সোসরিজসহ অন্যরা রপ্তানি করতে পারলে আপনারা করতে পারেন না কেন? আপনাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অভাব। কীভাবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো যায় সেখানে আপনাদের হাত দিতে হবে। প্রণোদনা আপনারও নিতে পারবেন, কিন্তু সারাজীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে লাভবান হতে পারবেন না। নিজেরা বাঁচতে অন্যকে মেরে ফেলতে হবে, এমনটি তো ভাবার নয়।
দেশের পোশাক খাত গত এক বছর ধরে আইসিইউতে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল মিলসের মালিকরা বলেছেন তারা আইসিইউতে আছেন। গত এক বছর ধরে আমরাও বলে যাচ্ছি, বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর আইসিইউতে আছে। আইসিইউ থেকে বের করার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। নীতি সহায়তা দিয়ে সেখান থেকে বের করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সেই জায়গাটিতে আমরা কী নীতি সহায়তা পাচ্ছি?’
‘সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত পোশাক শিল্পের জন্য হুমকি: পাট শিল্পের পরে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধের পাঁয়তারা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নতুন শ্রম আইন যেটি হয়েছে, এই আইনটিই যথেষ্ট, দেশের পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করতে দিতে। এরমধ্য দিয়ে দেশের পোশাক শিল্পের ধ্বংসের শুরুটা হয়ে গেছে।’
সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত শনিবার থেকেই যেদিন ওই চিঠিটার খবর আসে, সেদিন থেকেই লোকাল স্পিনিং মিলগুলো পিআই ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছে। আবার প্রাইসও কিন্তু তারা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্পিনিং মিল করতে কতো টাকা বিনিয়োগ হয় সেটি পর্যালোচনা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্পিনিং মিলগুলোতে কতো টাকা বিনিয়োগ হয়, সেটি পর্যালোচানা করলেও বুঝতে পারবেনা, কেন উৎপাদন খরচ বেশি হয়।’
ক্রেতারা যাতে পোশাকের সঠিক দাম দেয় সে বিষয়ে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘আমি ইউরোপীয় ইউনয়নকে বলেছিলাম তোমার ব্র্যান্ড বায়াররা আন এথিক্যাল দাম দিয়ে আমার ইন্ড্রাস্ট্রি ধ্বংস করছে, এটি তোমরা বলবে না। বায়াররা কেন আমাদের পণ্যের দাম কম দিচ্ছে, সেটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছে না। সেই জায়গায় আমরা যদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে ফেলি তাহলে তো আমরা টিকে থাকবো না। এথিক্যাল প্রাইস নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এটি নিয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।’
এদিকে, ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সরকারি সুপারিশ অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে সরকার অনতিবিলম্বে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে। এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে আমরা আমাদের শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।
তিনি বলেন, এই একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তি এর ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানির ওপর এ জাতীয় কোনো রক্ষণশীল শুল্ক আরোপের আগে অবশ্যই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে সিরিয়াস ইনজুরি এর বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু এখানে এটা করা হয়নি। এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কেবল অনভিপ্রেতই নয় বরং নীতিগতভাবেও চরম প্রশ্নবিদ্ধ। সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি শিল্প, তথা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয়কর।
সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, পরিচালক ফয়সাল সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম, পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান, পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল, সাবেক সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং বিজিএমইএ’র জনসংযোগ ও প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন




















