বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ১৬ জনের নামে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা দুদকের
নিজস্ব প্রতিবেদক :

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, তার দুই ছেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাত সোবহান ও পরিচালক সাফিয়াত সোবহান এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ‘৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আজ বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুদক প্রধান কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানান দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন। তিনি আরো জানান, দুদকের উপ পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি দমন আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২ ও ৩) ধারায় মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় ১৬ আসামির উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে বসুন্ধরা ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাত সোবহান ও পরিচালক সাফিয়াত সোবহান।এছাড়াও আরো ১৩ আসামির মধ্যে রয়েছে; ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক মনোয়ারা শিকদার, পারভীন হক শিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক শিকদার, রন হক শিকদার, মো. আনোয়ার হোসেন ও একে এম এনামুল হক শামীম, ব্যাংকটির ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসিনা সুলতানা; সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার আরিফ মো. শহিদুল হক; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ক্রেডিট ইন-চার্জ আনিসুল হক; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সুলতানা পারভিন; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সুবল চন্দ্র রায় এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ কামরুল হাসান মিঠু।
দুদক মামলায় বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির নিয়ম-কানুন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বসুন্ধরা ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট লিমিটেডের নামে মোট ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেন। পর্যাপ্ত জামানত, স্টক রিপোর্ট, পরিদর্শন প্রতিবেদন, ক্রেডিট রেটিং ও গ্রাহকের প্রকৃত ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার যাচাই ছাড়াই ভুয়া আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে এ ঋণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকের ওপর অন্যান্য ব্যাংকে থাকা ৬২৯.১৬ কোটি টাকার দায়-দেনার বিষয়টিও ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়। বসুন্ধরা গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও গ্রাহককে আলাদা গ্রুপ দেখিয়ে একক ঋণগ্রহীতা ঋণসীমা অতিক্রম করে ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমেও ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অভ্যন্তরীণ নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ফান্ডেড ঋণের ৬০০ কোটি টাকা বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে আসামিরা তা বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর ও নগদ উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন এবং অর্থের উৎস ও মালিকানা গোপন করতে মানিলন্ডারিং কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন।
মামলায় বলা হয়েছে, আসামিরা ব্যাংকের প্রচলিত বিধি-বিধান ‘লঙ্ঘন করে এবং ঋণের শর্ত পূরণ না করেই’ বসুন্ধরা ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ৬০০ কোটি টাকা ‘ফান্ডেড’ ও ৭৫০ কোটি টাকা ‘নন-ফান্ডেড’মোট ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেন। দুদক বলছে, পরবর্তীতে বিতরণ করা ফান্ডেড ঋণের ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ না করে পরস্পর যোগসাজশে সে টাকা আত্মসাৎ করেন আসামিরা।
‘আত্মসাৎ করা টাকার অবৈধ উৎস, অবস্থান এবং মালিকানা গোপন’ করার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটিডের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়।
এছাড়া এই অর্থের আরেকটি অংশ রংধনু বিল্ডার্স নামে প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করে ঋণ সমন্বয় ও নগদ উত্তোলন করে অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করেন।
মামলায় ঘটনাকাল বলা হয়েছে, ২০১৮ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী বড় বড় ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়েও অনুসন্ধানে নামে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা।
তার ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে ‘সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, ভূমি জবরদখল, ঋণের অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ স্থানান্তর ও হস্তান্তর, অর্থ পাচারের’ অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।
এর অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের দুদকে তলবও করা হয়েছিল।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) বসুন্ধরাসহ পাঁচ বড় কোম্পানির মালিকদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। তাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের লেনদেনের তথ্য চেয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠায়।এরপর অক্টোবরে আহমেদ আকবার সোবহান ও তার চার ছেলেসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ওই মাসেই দুদকের আবেদনে আহমেদ আকবর সোবহানসহ পরিবারের ৮ সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।
আ. দৈ./কাশেম




















