রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংক
খেলাপি ঋণের নীতিমালায় বিপাকে ব্যবসায়ীরা
রমজান আলী
প্রকাশ: সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৯:১৭ পিএম   (ভিজিট : ১৭২)
X

বাংলাদেশ ব্যাংক এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে তিন মাস অনাদায়ী থাকলেই ঋণকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করছে, যা আগের ছয় মাসের অপেক্ষার নীতিমালাকে বাতিল করেছে। ফলে খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। আর এতে বিপাকে পড়ছে সাধারণ ব্যবসায়ীরা। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতীতের ভুল নীতির খেসারত এখন দিতে হচ্ছে পুরো অর্থনীতিকে। বর্তমান নীতিনির্ধারকরা উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সহজ ও দ্রুততম সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে পারবে এমন নীতি সহায়তা দেবেন বলে আশা করা হলেও কার্যত তেমন পদক্ষেপ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব নীতিমালা প্রণয়ন করছে, তা ব্যবসা-বিনিয়োগের জন্য কতটা সহায়ক তার একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা প্রয়োজন এবং দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা দরকার।

 ব্যাংকঋণের সুদহার আগে ৯ শতাংশ ছিলো। সেটাকে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভব হচ্ছে না।  পরিস্থিতি এতটাই সংকটময় যে ব্যবসায়ীসমাজ ছয় মাস পর্যন্ত খেলাপি ঋণের আইন শিথিল করার দাবি তুলেছে। দেশে বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিত। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকঋণ গ্রহণে জটিলতা এবং নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক বাধার কারণে নতুন উদ্যোক্তা যেমন নিরুৎসাহ হচ্ছেন, তেমনি বিদ্যমান উদ্যোক্তারা কার্যক্রম বিস্তারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিয়মের কঠোরতা নয়, বাস্তবে অর্থনৈতিক মন্দা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবেও খেলাপির হার বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। তবে এতে খেলাপি ঋণ কমার বদলে উল্টো বেড়েছে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী তিন মাস ঋণ পরিশোধ না করলে সেটি সরাসরি খেলাপি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ফলে আগের ছয় মাস অপেক্ষার বিধান বাতিল হওয়ার পর থেকেই ঋণের শ্রেণীকরণে বড়সড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান,  কঠোর নিয়মের কারণে প্রকৃত খেলাপি ঋণ বেশি করে বাড়ছে। এছাড়া খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই নীতি ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা বাড়াছে। এছাড়া বাস্তবায়নে ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যা কারণে প্রাইভেট সেক্টরে ধস নামতে শুরু করেছে।  উচ্চ সুদহারসহ বেশ কয়েকটি কারণে এ হার ৮ শতাংশের বেশি উঠছে না বলে তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। গণ অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকা বেসরকারি খাতের ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার মে মাসেও আগের মাসের চেয়ে কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, মে মাসে এ খাতে ঋণ ছাড়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। আগের মাস এপ্রিলে যা ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ হিসাব বলছে, টানা সাত মাস থেকে বেসরকার খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দেওয়ার ঋণ বাড়ার হার ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। সবশেষ অক্টোবরে এ খাতে ৮ শতাংশের বেশি (৮ দশমিক ৩০ শতাংশ) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

সংকোচনমূলক নীতি বজায় রাখার ধারায় চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবুও এ হার ৮ শতাংশের বেশি উঠছে না উচ্চ সুদহারসহ বেশ কয়েকটি কারণে বলে তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে উচ্চ সুদ, গ্যাস সংকট, কঠোর নীতির মত কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিচ্ছেন। “ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বেঁচে থাকার সংগ্রামে রয়েছে। ব্যবসা করতে খরচ এত বেড়েছে যে নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।”

ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে না যাওয়ার বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। এ কারণে কারখানা স্থাপনের মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে। 

করোনার কারণে এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। এর ওপরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে কারখানা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আবার ক্রেতাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমার কারণে রপ্তানি বাণিজ্যও কমেছে। এসব কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন। 

ঢাকা ও আশপাশের এলাকার শিল্পকারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাপকহারে বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া কারখানায় কাঁচামাল নিয়ে আসার সময় ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা, বিভিন্ন স্থানে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানি তো আছেই। এতে দেশি বাজারের জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোও বিপাকে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির দুর্বলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, স্বচ্ছতার ঘাটতিসহ নানা কারণে ব্যাংকিং খাতে ফিরছে না শৃঙ্খলা, ধুঁকছে শিল্প আর মন্দা কাটছে না অর্থনীতির। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনতে প্রচেষ্টা চালালেও বাস্তবায়ন দুর্বলতায় এর সুফল মিলছে না। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় গ্রাহকের অনিয়মিত ঋণকে পুনঃ তফসিল করে খেলাপি দেখায়নি। কিন্তু এখন সেই সুযোগ না থাকায় প্রকৃত খেলাপির হিসাব বেরিয়ে এসেছে। এতে যেমন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছি। আগের সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাত যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে সময়ের প্রয়োজন। আগের সকরারের আমলে নির্দিষ্ট কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে পুরো ব্যাংকিং খাত চলে গিয়েছিল। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি একেবারেই ছিল না। আমরা চাই, ভবিষ্যতে আর যেন এমন না হয়। এ জন্যই ব্যাংক খাতকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। ’
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের নীতিমালার মেয়াদ ৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছরে উন্নীত করা হোক।  বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এছাড়া, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট কমানো হোক। নিয়ম বহির্ভূত কারণে ফোর্সড লোনের শিকার হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান চেক ডিসঅনার এবং অর্থঋণ মামলার মতো জটিলতার শিকার হচ্ছে। যা তাদের কার্যক্রমকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। 

দেশের অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতি সহায়তা দিচ্ছে, তা যেন শুধুমাত্র বড় রপ্তানিকারকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোও যেন এই সুবিধা পায়, সে ব্যাপারে জোরালোভাবে ভূমিকা রাখতে আহবান জানান। প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা ব্যাংকিং সমস্যার কারণে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। নীতি সহায়তা পেলে এই কারখানাগুলো পুনরায় চালু হয়ে অতিরিক্ত এক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝