মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব মান দিবস বুধবার
মান সনদ ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
শাহীন রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ০)
X

পণ্য ও পরীক্ষাগারের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বদেশের। পরীক্ষাগারের পরীক্ষার ফল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং মানদণ্ডের কার্যকর প্রয়োগে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে রপ্তানি বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।

এদিকে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আগামীকাল বুধবার দেশে পালিত হবে ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস।  এ বছর বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শেয়ার্ড ভিশন ফর আ বেটার ওয়ার্ল্ড—অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ক্লিন এনার্জি’। বাংলায় এর ভাবার্থ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির জন্য ৭৯টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব মান নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪ হাজার ৬৩১টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির একটি হলো অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন। সংস্থাটি ২০১৫ সালে পরীক্ষণ ও ক্যালিব্রেশন পরীক্ষাগারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। পরে ২০২০ সালে চিকিৎসা পরীক্ষাগার ও পরিদর্শন সংস্থার ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি পায়। এর ফলে স্বীকৃতির আওতাভুক্ত পরীক্ষাগারগুলোর পরীক্ষার ফল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানিকারকদের পণ্যের মান প্রমাণ, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় পরীক্ষা করার প্রয়োজন কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সুফল পুরো শিল্প খাতে ছড়িয়ে দিতে পরীক্ষাগারের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি পণ্যের জাতীয় মান নির্ধারিত থাকার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ৩১৫টি পণ্যের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সনদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। এই ব্যবস্থা পণ্যের নিরাপত্তা, গুণগত মান এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানদণ্ডের কার্যকর প্রয়োগ, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার এবং উৎপাদকদের সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে তাদের আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশ ছিল বস্ত্র ও পোশাকজাত পণ্য। একই সময়ে ইইউ বাংলাদেশের পণ্যবাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার ছিল। এই অবস্থান ধরে রাখতে পণ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার, কারখানার নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম ও উৎপাদন সক্ষমতা নয়, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরবরাহশৃঙ্খলের দায়িত্বশীলতার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তারা বলছেন রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মান নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ২০৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই প্রবৃদ্ধি নতুন শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এসব পণ্যের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব, নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রযোজ্য কারিগরি বিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

তারা বলছেন পণ্যের ধরন ও গন্তব্যভেদে আন্তর্জাতিক সনদের প্রয়োজনীয়তাও ভিন্ন। ইউরোপীয় বাজারে নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, উপাদানের তথ্য, পরিবেশগত প্রভাব ও লেবেলিংয়ের শর্ত থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও পণ্যের ধরন অনুযায়ী আলাদা পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে শুধু জাতীয় সনদ থাকলেই সব বাজারে পণ্য প্রবেশের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। রপ্তানিকারকদের লক্ষ্যবাজারের নির্দিষ্ট নিয়ম সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা জরুরি।

হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও সনদের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের নীতিপত্রের বরাতে হালাল সনদের বিভিন্ন ব্যবস্থা, স্বীকৃত পরীক্ষাগারের ঘাটতি এবং দক্ষ জনবলের অভাবের কথা উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ বড় বাজারে সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের খাদ্য ও অন্যান্য হালাল পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে সুবিধা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মান সনদের সুযোগকে বাস্তব রপ্তানি সুবিধায় রূপান্তর করা। এ জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আওতা বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকদের সহায়তা এবং মানদণ্ড লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত নিয়ম সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের নিয়মিত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

তারা বলেন সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক মান সনদ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অগ্রগতি রপ্তানি সম্প্রসারণ ও পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে শুধু স্বীকৃতি অর্জন নয়, পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা, সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মানদণ্ডের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তা সম্ভব হলে বাংলাদেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জনের সুযোগ পাবে।


আ.দৈ/এসআর







Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝