ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছুঁইছুঁই, আক্রান্ত লাখের পথে
ঘরে ঘরে জ্বর, ডেঙ্গুর প্রকোপে উদ্বেগ বাড়ছে দেশে
ঘরে ঘরে জ্বর, হাসপাতালে রোগীর চাপ; এক দিনে ভর্তি ১,৬৩১, বাড়তি এক হাজার শয্যা প্রস্তুতের উদ্যোগ
বিশেষ প্রতিনিধি

ডেঙ্গুর প্রকোপে ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে দেশে। ঘরে ঘরে জ্বরের রোগী, হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ভিড়। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৯ জনে। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯৭ হাজার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তবে সংক্রমণের বিস্তার ও রোগীর চাপ সামাল দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৩১ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে ৯৭ হাজার ৮২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯১ হাজার ৭ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক রোগী সুস্থ হলেও প্রতিদিন নতুন রোগী আসায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
অক্টোবরে বাড়ছে উদ্বেগ॥ ডেঙ্গুর প্রকোপে সেপ্টেম্বর মাস ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ওই মাসে এ রোগে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়, যা আগস্টের ৪৩ জনের মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি। মাসের শেষ দিকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকায় অক্টোবরেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল উদ্বেগজনক। ৬ অক্টোবরের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৯৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন ডেঙ্গুতে মারা যান ১০ জন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। পরবর্তী দিনগুলোতেও মৃত্যু ও নতুন রোগী ভর্তির ধারাবাহিকতা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
শয্যা সংকটে বাড়ছে চাপ॥ রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত শয্যা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোকেও শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।
এর আগেই রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৮ শয্যার একটি ওয়ার্ডে ১৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। রোগীর চাপের কারণে কোনো কোনো হাসপাতালে মেঝে ও বারান্দায়ও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছিল। চিকিৎসক ও নার্সদের আশঙ্কা, রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ওষুধ প্রয়োগ ও জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকার বাইরেও ছড়াচ্ছে সংক্রমণ॥ ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, এক দিনে ঢাকা বিভাগে ৭০৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩৪, বরিশাল বিভাগে ২১৯, খুলনা বিভাগে ১৮৪, রাজশাহী বিভাগে ১৪১, রংপুর বিভাগে ৭৫, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ এবং সিলেট বিভাগে ১৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ, দেশের আটটি বিভাগেই নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীর হাসপাতাল ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দিকে নজর দিলে চলবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, সেখানে হাসপাতালের প্রস্তুতি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
বৃষ্টির পানি ও মশার প্রজননস্থল বড় ঝুঁকি॥ সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরনই ছড়িয়ে পড়েছে বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন—এমন ব্যক্তিরাও পুনরায় সংক্রমিত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষজ্ঞরা তাই জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার বিকল্প নেই॥ চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বরের সঙ্গে শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বা দুর্বলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একদিকে হাসপাতালের চিকিৎসাসক্ষমতা বাড়ানো, অন্যদিকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করার বিকল্প নেই। মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছানো এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সবচেয়ে জরুরি।
আ.দৈ/এসআর




















