শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, ক্ষুব্ধ এমপিরা
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১৯ পিএম   (ভিজিট : ০)
X

সারাদেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তালিকা প্রণয়নে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিদের একাংশ। ডিলার নিয়োগে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে কৃষি সচিব সেলিম খান জুয়েল এবং সার ডিলার নিয়োগ শাখার প্রধান যুগ্ন সচিব কামরুলের বিরুদ্ধে।

সুত্র জানিয়েছেন এই টাকা কালেকশন করেছেন সচিবালয়ের শীর্ষ তিন দালাল, শামীম ওরফে মাইনুল শামীম, সবুজ,  এবং রিপনের মাধ্যমে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ৯ অক্টোবর বিভিন্ন জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত একাধিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, কুমিল্লা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার তালিকা রয়েছে। 

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সারের লাইসেন্স দেওয়ার নামে অনৈতিক লেনদেনের চেষ্টা চলছে। ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’ তিনি এ বিষয়ে জেলা  প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করেন।

সরিষা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া জিয়া এন্টারপ্রাইজের নাম উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য। তবে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য, নিয়োগে নীতিমালার বাইরে কিছু করা হয়নি। নিয়োগ পাওয়া জিয়াউর রহমান ভূঁইয়াও ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। 

গাইবান্ধাতে অভিযোগঃ গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সদস্য এবং যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সম্পাদক সাইদুর রহমান রয়েলের অভিযোগ সাঘাটা থানার প্রকাশিত তালিকায় ০১ নং পদুমশহর ইউনিয়নে যে নাম প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য সচিব সেলিম খানের লোক দালাল শামীম ২৫ লক্ষ টাকা নিয়েছে। উপজেলা এবং জেলা থেকে প্রেরিত তালিকায় তার ভাই নাম ১ নং ক্রমিকে ছিলো, কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় যে নাম প্রকাশ করা হয়েছে তার নামের মন্তব্যের ঘরে লেখা আছে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত সিরিয়াল নম্বর ১ যা সম্পূর্ন মিথ্যা।

 সচিব সেলিম খান সারাদেশ থেকে টাকা তোলার জন্য জেলা প্রশাসক থেকে সিলগালা করে প্রেরিত লিষ্ট যাচাই বাছাই করতে ২৪সেপ্টেম্বর মন্ত্রনালয়ের অভ্যন্তরীন কমিটি করলেও পরে ০১ তারিখে জেলা প্রশাসক কতৃক প্রেরিত তালিকা প্রকাশ হওয়ার ভয়ে নিজ মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতে না দিয় তাদের হাত থেকে সেই কাগজ ফেরত নেন ফেনীর কৃষিকার্ড প্রোগ্রামের আগের বিকালে অর্থাৎ ১ তারিখে। এর মাঝে যাদের লিষ্ট সংগ্রহ করা দরকার সবাই করে ফেলেছে। আমরা সবাই তার বিচার চেয়ে হাইকোর্টে যাব। 

গাইবান্ধারই আরেকটি উপজেলা, ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক সালাম সরকার বলেন, আমার থানার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নে যার ব্যবসাতো দুরের কথা বাড়ীঘর ই নাই, যার নাম উপজেলা থেকে বাদ দিয়ে জেলায় পাঠানো হইছে তার নামে নাকি সারের ডিলার হচ্ছে এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নে। যদি তাই হয় তবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনে নামবো আমরা।

নয়ন মন্ডল যে গোডাউন এর ঠিকানা ব্যবহার করেছে সেটা বাস্তবে কোন গোডাউন নয় অন্য একজনের পান এর দোকান। সুতারাং তারে যদি কোন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ডিলার দেওয়া হয় আমরা তা মানবো না।

সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জুয়েল এবং সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব কামরুল হাসানের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক সুপারিশ উপেক্ষা করে একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ডিলারপ্রতি তাদের নিয়োগকৃত দালাল রা ২০-২৫ লক্ষ টাকা করে কালেকশন করে  নিয়েছেন এবং তাদের দুজনের হাতে পৌছেছে  ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেলিম খান যত টাকা ঘুষ দিয়ে সচিব হয়েছেন তার চেয়ে বেশী টাকা সে একমাসেই তুলে ফেললেন। সচিব সেলিম খান আগস্টে রাজশাহীতে এক সভায় সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তালিকা প্রণয়নে দুর্নীতির অভিযোগ তার বিরুদ্ধেই বেশি।

সারা দেশে ৪ হাজার ৯৩১টি প্রস্তাবিত ডিলারশিপের বিপরীতে ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় সাড়ে নয়টি আবেদন রয়েছে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী সেলিম খান গত ৫ আগস্টের পর বিএনপির সমার্থক বনে যান। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মীর সরাফত আলী সপুর খালাতো ভাই পরিচয় দিলেও তা সত্য নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেলিম খানের সঙ্গে দূরতম আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই সপুর। দল ক্ষমতায় আসার পর কোন সুবিধা না পাওয়া সপুকে কিভাবে ম্যানেজ করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ: ইউনিয়ন পর্যায়ে সার ডিলার নিয়োগে বিএনপির নেতাকর্মীরা হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য শুরু করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে এই অভিযোগ করেন তিনি। সারজিস লিখেছেন, প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে এক বা একাধিক সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইউএনও অফিসের মাধ্যমে সেই তালিকা ডিসি অফিসে পাঠানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, উপজেলা ইউএনও অফিস থেকে যে তালিকা পাঠানো হচ্ছে সেই তালিকা করছেন উপজেলা বিএনপির নেতারা। বিএনপি দল না করলে অন্য কোনো যোগ্য, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম সেই তালিকায় আসার কোনো সুযোগ নেই। অথচ স্থানীয় বিএনপি নেতারা তাদের নিজেদের নামে, স্ত্রী, ভাই-বোন, বাবা-মায়ের নামে-বেনামে সেই ডিলারশিপ পাওয়ার সব অপচেষ্টা করছেন। সুযোগ থাকলে অনাগত সন্তানের নামেও লাইসেন্স করার চেষ্টা করতেন।

তিনি লেখেন, যোগ্য হলে করতেই পারেন সেটা নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই যখন বিএনপির পরিচয় কিংবা লবিং ছাড়া নির্দলীয় কোনো ব্যক্তি সেই প্রাথমিক তালিকায় থাকার সুযোগটা পর্যন্ত পান না। বিরোধীদলের সমর্থনকারী হলে যত যোগ্যই হোক, কোনো সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত একটা ডিলারশিপের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার দর স্থানীয়ভাবে উঠেছে ৩০-৩৫ লাখ টাকা! তিনি আরও লেখেন, যখন কোনো ব্যক্তি ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করেন, তখন সেই অর্থ উঠিয়ে নিতে পরবর্তীতে যা করা দরকার তিনি তাই করেন। এতে কৃষক বাঁচলো নাকি মরলো তা নিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না।

এভাবে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে বিএনপি তাদের নেতাকর্মীদের হাতে কিংবা তাদের ছত্রছায়ায় যারা আছে তাদের হাতে লাইসেন্স তুলে দিচ্ছে। এই লাইসেন্সধারীরা পরে অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকার নির্লজ্জভাবে সেই সিন্ডিকেটের কাছে মাথানত করছে এবং মূল্যবৃদ্ধি করছে। যেটা ইতোমধ্যে জ্বালানি এবং এলপিজির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে- লাইসেন্সধারী তারা, অবৈধভাবে মজুত করছে তারা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে তারা, সিন্ডিকেট করছে তারা, এক রাতের ব্যবধানে জনগণের শত কোটি টাকা বাগিয়ে নিচ্ছে তারা! অতঃপর বৈশ্বিক সংকটের মুলা ঝুলিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দাম বাড়াচ্ছে সরকার।

 জিম্মি করছে জনগণকে, ভোগান্তি বাড়ছে জনগণের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে স্থানীয়  বিএনপির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠলেও টাকা নিচ্ছেন কৃষি সচিব সেলিম খান। মধ্যস্বত্ব ভোগী হয়ে লাভবান হচ্ছেন তার নিযুক্ত দালাল, সবুজ, শামীম, হাসান, রিপন, হালিম সহ অন্তত ২০-২৫ জন দালাল। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সচিব সেলিম খান জুয়েল এবং যুগ্ন সচিব কামরুল হাসানের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করতে একাধিক কল দেওয়া হলে ও তারা ফোন ধরেন নাই। 

আ.দৈ./একে


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝