৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ‘পিআরএল’ শুরু,আগের পদে থাকতে খরচের ‘বিগ বাজেট’
ডিএনসিসিতে দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রফিক এখনো চেয়ার ছাড়েনি
আবুল কাশেম:

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও মধুর চেয়ারটি ছাড়তে নারাজ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার ‘পিআরএল’ শুরু হবার কথা রয়েছে। কিন্তু তিনি আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারটি দখলে রেখেছেন। তার চেয়ার দখলে রাখা এবং ডিএনসিসি ছেড়ে যেতে না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম এবার খরচের ‘বিগ বাজেট’ নিয়ে ডিএনসিসিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বের (বিদ্যুৎ) দুই পদই ধরে রাখার জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে বেশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত দুই সপ্তাহ যাবৎ গুলশানে নগর ভবনসহ ডিএনসিসির বিভিন্ন দপ্তরে ‘টক অব দ্যা ডিএনসিসি’ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর সাবেক খাদ্য মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ট আত্নীয় ও দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলামের চেয়ার দখলে রাখার বিষয়টি। ডিএনসিসিতে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। আলোচনায় আরো উঠে আসছে ডিএনসিসিতে শিগগিরই বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য কয়েক শত কোটি টাকার কেনা কাটার টেন্ডার হবার কথা রয়েছে। আর এসব টেন্ডার মানেই মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য লাভের সুযোগ টুকুও ধরে রাখা।
নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিনিধিকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের ‘আইন ও বিধি’ লঙ্ঘন করে রহস্যজনক কারণে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর, সুবিধাভোগী, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, কোটি কোটি টাকা লোপাটকারী সাবেক মেয়র মো.আতিকুল ইসলাম ও সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সিন্ডিকেটের সদস্য বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলামকে অবৈধভাবে এক সাথে দুইটি পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে চলছে লুকোচুরি। এই দুইটি পদের দায়িত্বে থাকার জন্য প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের খরচের ‘বিগ বাজেটে’ রয়েছে। ওই বাজেটের আকর্ষণে তার পক্ষে সরাসরি তদবিরে নেমেছেন ডিএনসিসির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং প্রশাসকের দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, মোটা অংকের অর্থের টানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে নানা কৌশলে এবার বিএনপির পরীক্ষিত এবং সৎ কর্মকর্তা বানানোর চেষ্টা চলছে।
তারা আরো জানান, ডিএনসিসির সচিবের দপ্তর থেকে অত্যন্ত ‘গোপনীয়তা ও লুকোচরির’ মধ্যদিয়ে গত মাসের শেষ সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে এক বছরের জন্য ওই দুইটি পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগের জন্য আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে কোন আদেশ জারি করা হয়েছে কিনা, কিংবা ডিএনসিসির পক্ষ থেকে করা ওই আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে কিনা, এই মর্মে কোন তথ্য কেই জানেন না। এমনকি ডিএনসিসির নিজস্ব “ওয়েভসাইটেও” প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের ‘পিআরএল’ সংক্রান্ত নতুন আদেশ , কিংবা চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ দেখা যাচ্ছে না।
তারা বলেন, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের দীর্ঘ চাকরি জীবন পর্যলোচনা করলে , দেখা যাবে, ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অপরাধে অবিভক্ত ‘ঢাকা সিটি করপোরেশনের’ সাবেক মেয়র মরহুম মো.হানিফ ও মরহুম সাদেক হোসেন খোকার মেয়াদকালসহ অধিকাংশ মেয়র এবং প্রশাসকের আমলে তাকে দফায় দফায় কখনো ‘সাময়িক বরখাস্ত, কখনো ওয়েজডি’ আবার কখনো দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার ঘটনা ঘটেছে। ফলে তার ব্যক্তিগত নথিতে ওইসব বিষয়গুলো সংযুক্ত রয়েছে। প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত নথি এতোবড় হয়েছে যে, কেজিতে ওজন করলে ১৫/২০ কেজি হবে বলে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দুনীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেশকিছু গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখ্য হলো; অতিরিক্ত দামে ও অত্যন্ত নিম্ম মানের ‘ওয়াকিটকি ক্রয়’ ক্ষমতার অপব্যহার, নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বেশ আলোচিত। ২০২৫ সালের ১৭ আগষ্ট ‘ওয়াকিটকি ক্রয়ে’ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করে দুদক।
এছাড়াও এলিডি লাইট ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ডিএনসিসিতে সড়ক বাতি ক্রয়ে দুর্নীতি, বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য গাড়ি যন্ত্রাতি ক্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে গাড়ি ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে। তার বিরুদ্ধে ডিএনসিসিতে বিদ্যুৎ বিভাগে গোপনে কোটি কোটি টাকার নানা আইটেম কেনা কাটায় ঠিকদারির অভিযোগও রয়েছে।
আরো জানা যায়, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে গোপনে অনুসন্ধান চলছে। অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে ৭/৮ টি দুর্নীতির নানা অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অথচ প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রশাসকের দপ্তর একজন সৎ, ভালো কর্মকর্তা এবং বিএনপির লোকজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জোর তৎপরতা চলছে।
তবে এসব বিষয়ে প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মুঠো ফোন কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি। এর আগে তাকে ক্ষুধে বার্তা পাঠানোর পরও তিনি জবাব দেননি।
এদিকে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে আলোচিত বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরআগে তার মুঠো ফোনের “হোয়াটঅ্যাপে” ক্ষুধে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি হলো; ‘ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলামের সরকারি চাকরির মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ। এরপর থেকে তার ‘পিআরএল’ শুরু হবার কথা। কিন্তু তিনি আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পর্যন্ত চেয়ার দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার চুক্তি ভিত্তিক মেয়াদ কি বেড়েছে। ডিএনসিসির ওয়েভসাইটে তার ‘পিআরএল’ কিংবা চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই। ফলে এসব বিষয়ে আপনার বক্তব্য প্রয়োজন।’ কিন্তু তিনি জবাব দেননি।
পরে প্রশাসকের একমাত্র মুখপাত্র জনংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনকে ফোন দিলে, তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। এর আগে তাকে ক্ষুধে বার্তা পাঠানো হয়, কিন্তু তিনি কোন জবাব দেননি।
এদিকে উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের দু'জন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব সংক্রান্ত জারি করা স্মারক নং-০০.০০.০০০০.১৭০. ৬০.০১৫.১৯.১৬৭ এবং ২০২০ সালের ০৯ নভেম্বর স্মারক নং-৪৬,০০,০০০০,০৭০ ,১১,০০১,২০,১১৭৬, মূলে উল্লেখ করা হয়েছে, উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশ ক্রমে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত দু'জন কর্মকর্তা জনাব মোঃ লিয়াকত আলী মিয়া ও জনাব মো: মোহসীন আলীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ নেই।
(ক) সিটি কর্পোরেশনের জন্য পৃথক আইন ও নিয়োগ বিধিমালা বিদ্যমান থাকায় উক্ত আইন ও নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা/কর্মচারীগণের চাকরি নিয়ন্ত্রিত হবে; (খ) স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯-এ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে উল্লেখ না থাকায় কোন কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবসর-উত্তর ছুটির পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ নেই; এবং (গ) সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ১(৩) (ক) ধারা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা এতে নিয়োজিত ব্যক্তিপণের জন্য এই আইনের বিধানা বলি প্রযোজ্য হবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (নাসরিন সুলতানা) ২০২০ সালে ১১ নভেম্বর মতামতে স্বাক্ষর করেন।
আ. দৈ./একে




















