সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
Ajker Dainik

সংসারের কাজ এবং নারীদের শ্রমমূল্যের অর্থনীতি

আজকের দৈনিক | তাসনিম মাহবুব

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৪, ০৫:২০ পিএম

সংসারের কাজ এবং নারীদের শ্রমমূল্যের অর্থনীতি

গত কয়েকবছর ধরে একটি আলাপ প্রায় উঠে আসছে- নারীদের গৃহস্থালি কাজের মূল্য আছে কি না? অনেকেই বলে থাকেন- মেয়েমানুষের আবার কাজ কী? ঘরের কাজ কোনো কাজ হলো!


একজন নারী যিনি সারাদিন রান্না থেকে আরম্ভ করে ঘর পরিস্কার, সন্তানদের যত্ন নেওয়া, সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন সবকিছুই করে চলেন নিরলসভাবে। গৃহস্থালি এসব কাজের জন্য একজন নারী কোনো শ্রমমূল্য কিংব বিশ্রাম কোনোটিই পান না। অথচ, নারী তার এই হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে স্বীকৃতি তো পান না উল্টো শুনতে হয়- এসব কী কোনো কাজ। 


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীদের গৃহস্থলি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে আলোচনা হয়ে চলেছে। ২০২১ সালে চীনে বেইজিং এর একটি আদালত এক দম্পত্তির বিচ্ছেদের সময় স্বামীকে নির্দেশ দেন বৈবাহিক অবস্থায় স্ত্রী যাবতীয় সাংসারিক কাজকর্মের জন্য তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে। এই ঘটনাটি একটি উদাহরণ যে নারীদের সাংসারিক কাজকর্মের জন্য যে শ্রমমূল্য রয়েছে সে বিষয়ে সচেতনতা আসছে।


বাংলাদেশের সমাজকাঠামো এখনো পুরুষতান্ত্রিক। ফলে, নারীদের সাংসারিক কাজকর্মকে এখনো অনেকেই অর্থনীতির সূচকে দেখতে রাজি নন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী- এই কাজগুলোর জন্য মূল্য কীভাবে নেবে নারীরা? মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামক প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সাল থেকে ক্রমাগত নারীর সেবামূলক কাজকে মূল্যায়ন এবং জিডিপির সূচকে অর্ন্তভুক্ত করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। 


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৯ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়- পুরুষের তুলনায় নারীর মজুরি ছাড়া করা কাজের পরিমাণ তিন গুণ। অর্থাৎ, এক সপ্তাহে একজন নারী গড়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা মজুরি ছাড়া কাজ করে থাকেন। অন্যদিকে শ্রম জরিপ ২০২২ এ বলা হয়েছে কৃষিতে পুরুষের তুলনায় নারীর অবদান অধিক। বাড়িতে গরু-ছাগল পালন, হাঁস-মুরগির যত্ন নেওয়া, ফসলের মাঠের খেয়াল রাখা, ফসল মাড়াই করা সবকিছুতেই নারীরা মজুরি ছাড়াই শ্রমদান করেন। 

 

অর্থনীতিবিদদের মতে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী গৃহস্থলির কাজের সাথে জড়িত। অথচ, তাদের এই কায়িক শ্রম এবং সময়ের বিনিময়ে তাদের অর্থনৈতিক প্রাপ্তির জায়গা শূন্য। যদি নারীদের এই সাংসারিক কাজের মূল্য জিডিপিতে যোগ হয় তবে জিডিপি আরও বাড়বে। 


বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন- সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারীরা ঘরের সব কাজ করেন, অথচ সেই কাজ কারো নজরে আসে না, সেই কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। সম্প্রতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থানীয় কমিটি নারীদের গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণে সুপারিশ করেছে। 


প্রশ্ন থেকে যায় কীভাবে নির্ধারিত হবে নারীদের সাংসারিক কাজের শ্রমমূল্য? মূলত, স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে নারীদের গৃহস্থালি কাজের মূল্য মাপা সম্ভব। 


এই যে মানসিকতা, এটা সৃষ্টি হয় কোথা থেকে? এর উৎস যদি আমরা খুঁজতে যাই- তবে শুরুতেই দেখতে পাই পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং সামাজিক কু-বিশ্বাস ও রীতিনীতি । পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তো পুরুষদের সুবিধার কথায় বলবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু ধর্মীয় কু-বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী! এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় আইন। রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিক সমান, এইটা শুধুমাত্র খাতা-কলমে আবদ্ধ না রেখে জন মানুষের জীবনেও প্রয়োগ করতে হবে। আর তা করা যেতে পারে সবার আগে সম্পদের সমান সুষম বন্ঠনের মাধ্যমে, ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের মধ্যে। এবং এই বোধটুকু সবার মধ্যে জাগ্রত করা উচিত যে সভ্যতার উন্নয়নে সকলপ্রকার কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ, হোক সেটা ঘরের কিংবা বাহিরের। যদিও আমাদের সরকার বর্তমানে নারীদের উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি দেখিয়েছে, তবুও এটি ছাড়া নারীদের আসল মুক্তি কখনোই সম্ভবপর নয়।


আমাদের ভিতরের যে কুসংস্কার সেটারও সংস্কার করা এখন অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা শুধুমাত্র মেকি-মিথ্যে ভালোবাসার দাবিদার বলে মায়েদের নামে মুখে ফেনা তুলে দিই, কিন্তু কাজের বেলা ঠনঠনা টনঠন এইটা হতে বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজসংস্কারক হতে শুরু করে বুদ্ধিজীবি সবাইকেই এই বিষয়ে সুগভীরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বুঝাতে হবে নারী সবই পারে, ইনাদের শুধুমাত্র ভালোবাসা নামক মিথ্যে কারাগারে বন্দী না রেখে উন্মুক্ত করা সময়ের দাবী।  নজরুল তো আর এমনি এমনি বলেন নি - 'বিশ্বের যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।'


এই জায়গায় আরো কিছু বিস্তারিত আলাপ করা যেতে পারে, সেটা হচ্ছে ঘরের কাজগুলো কেমন গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝানোর জন্য খুব ছোট বেলা হতেই সোনামণিদের হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া। হোক সে ছেলে সন্তান কিংবা মেয়ে সন্তান। মানে, সেই মানসিকতা তৈরি করা যাতে কাজের কোন শ্রেণীভেদ না থাকে সেই ব্যবস্থার মধ্যে আনা। আর তখনই জাতীয় পর্যায়ে দেশের সাফল্য আশা করা যায়। নইলে আমাদের যেই তিমির অবস্থানে অবস্থান, সেখানেই রয়ে যাবো আরো শত-শত বছর, এতে কোন দ্বিরুক্তি নেই। 


হ্যাঁ, এখন কথা হচ্ছে এটা কি খুব সহজেই করা যাবে! না, যাবে না। এর জন্য বাঁধা আসবে ওই দুটো যায়গা হতেই, যা আমি শুরুতেই বলেছিলাম পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তথা বলয় এবং সমাজে চলা নারীবিদ্বেষী  তথা উগ্র গোষ্ঠী হতে। তাই তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ভাবেই দমন করা জরুরি প্রয়োজনীয় আইন তৈরির মাধ্যমে। রাষ্ট্রকে বলতে হবে- রাষ্ট্র হচ্ছে একটা ব্যবস্থা যেখানে সকল নাগরিকের সুন্দর জীবন নিশ্চয়তার অঙ্গীকারবদ্ধ। 


নারী কিংবা পুরুষ যেই সংসারের কাজগুলো করুক না কেন- তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান এবং কৃতিত্ব অবশ্যই দিতে হবে। আর সেটা কিভাবে সম্ভব! সেটা সম্ভব হবে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার ফলে। একজন নারী কিংবা পুরুষের যখনই চিকিৎসার প্রয়োজন হবে - সে যেন বিনা বাঁধায় নিজ খরচে করতে পারে! একজন নারী কিংবা পুরুষ, যখনই তাঁর বস্ত্রের প্রয়োজন হবে, মার্কেট থেকে যেন কিনে নেওয়ার সামর্থ হয়! একজন নারী কিংবা পুরুষ, যখনই তাঁর বিনোদনের প্রয়োজন- তখনই যেন বিনা বাঁধায় তা সম্পন্ন হয়! এবং সেই সাথে অবশ্যই এগুলো বাহুল্য বর্জিতও হতে হবে। এগুলো যাতে বিলাসিতায় না রূপ নেয় সেদিকেও নাগরিকের লক্ষ্য রাখতে হবে মূল্যবোধ এবং মানবিক শিক্ষার মাধ্যমে। 


এছাড়াও সরকারের বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা অতীব জরুরি, তা হচ্ছে কর্মজীবি নারীরা যাতে নির্ভীগ্নে নির্দ্বিধায় তাদের কর্মস্থানে কাজ করতে পারে সেই নিশ্চয়তা প্রদান। এক, শিশুদের পরিচর্যাকেন্দ্র তৈরি করা প্রতিটি উপজেলায়। দুই, সকল বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও শতভাগ শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র নিশ্চিত করা। তিন, পুরুষদেরও ঘরের কাজে পারদর্শী করে গড়ে তোলা। 


সব শেষ কথা প্রয়োজন-ই প্রধান হাতিয়ার, যা তার লক্ষ্য থেকে কখনোই বিচ্যুত করে না। আমাদের উদ্দেশ্য যদি হয় সুখী এবং সুন্দর একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা, তবে সেক্ষেত্রে আর পিছন ফিরে তাকিয়ে থাকার আর কোন অবকাশ নেই, সামনে এগিয়ে আসতে কঠোর হতে কঠেরতর হতেই হবে রাষ্ট্রকে, যা তার জনগণ তথা সভ্যতারই একান্ত মঙ্গলকর।


দিনের পর দিন সংসারের সব কাজ করার পরেও নারীদের শুনতে হয়- তুমি কী করো ঘরে বসে? নারীদের গৃহস্থালি কাজের শ্রমমূল্য দেবার মাধ্যমেই বদলাতে পারে এই ধরণের মানসিকতা। লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে এসডিজি ৫ অর্জনে অবশ্যই নারীকে ঘরের কাজের শ্রমমূল্য দিতে হবে। কারণ, নারীর গৃহস্থালির শ্রমমূল্য প্রাপ্তি একদিকে তাকে যেমন দিবে আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে দেশের জিডিপিতেও তা যোগ করবে নতুন মাত্রা।


লেখক: শিক্ষার্থী, ৩য় বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আ.দৈ/এআর
 

Link copied!