আইসিসিবির প্রতিবেদন
সংকট মোকাবিলায় ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থার তাগিদ

জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি)। সংস্থাটি বলেছে, শুধু গ্যাস, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিংবা সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে দেশের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, দক্ষ অবকাঠামো, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মঙ্গলবার প্রকাশিত আইসিসিবির সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়।
আইসিসিবি বলেছে, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার বিষয় নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, শিল্পোন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানিনির্ভরতা বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সংস্থাটির মতে, সরকারের প্রস্তাবিত জ্বালানি রোডম্যাপ দেশের জ্বালানি খাতকে নতুনভাবে সাজানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এ পরিকল্পনার সুফল পেতে হলে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সক্ষমতা বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ জরুরি
আইসিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ বাংলাদেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, একই বছরের ২০ মে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড করা হয় ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। সংস্থাটি বলেছে, স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা বেশি হলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং প্রয়োজনীয় সময়ে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের ২০২৬-২০৩১ মেয়াদের পাঁচ বছরমেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে আইসিসিবি। এই কাঠামোয় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়ন, চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি বাড়ানোর আহ্বান
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইসিসিবি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের একটি কর্মসূচি চলমান রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১৫০টি কূপে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম কর্মসূচির আওতায় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩১টি কূপ খনন বা ওয়ার্কওভার করা হয়েছে। এতে দৈনিক আনুমানিক ২৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি দক্ষ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইসিসিবি।
এলএনজিতে নির্ভরতা নয়, উৎসের বৈচিত্র্য জরুরি
আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছে আইসিসিবি। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের ওঠানামা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়ে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি এলএনজি গ্রহণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ স্থাপনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। আইসিসিবির মতে, এসব অবকাঠামো জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হলেও এলএনজিকে দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে আইসিসিবি। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করে সংস্থাটি। এ জন্য বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, জমির প্রাপ্যতা, উন্নত সঞ্চালন অবকাঠামো, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, স্থিতিশীল নীতিমালা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও সরকারি স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে সীমিত জমির ওপর চাপ না বাড়িয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছে আইসিসিবি।
বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা
আইসিসিবির মতে, জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, বিদ্যুতের মূল্য এবং সরকারি নীতিমালা সম্পর্কে আগাম ধারণা চায়। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, জ্বালানি খাতের রোডম্যাপ দিকনির্দেশনা দিয়েছে, এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালার মাধ্যমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে পারলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও জোরদার হবে।
আ.দৈ/এসআর




















