এসআরবির সংবাদ সম্মেলন
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে নিহত ২০ বাংলাদেশি
মানবপাচার চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার
নিজস্ব প্রতিবেদক

উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাচারের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ২০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান।
এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের মূল হোতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও মো. আবু তাহের লেন্টুকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। মিজানুর জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির চেয়ারম্যান। এসআরবি জানায়, মঙ্গলবার রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার আটাইল এলাকা থেকে মিজানুর রহমানকে এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চাকরির কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ায়
তেদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি নির্মাণকাজে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠাত। এভাবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২১) নামের এক যুবককে রাশিয়ায় পাঠাতে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর রাজনকে নির্মাণকাজে নিয়োগ না দিয়ে রুশ সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছে এসআরবি। সেখানে টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে রাজনসহ প্রায় ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং বিশেষ করে ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু, অবস্থান ও দূরত্ব নির্ধারণে তাদের কাজে লাগানো হতো।
ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত রাজন
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন রাজন। এতে তাঁর শ্রোণিচক্রের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এসআরবির কর্মকর্তা জানান, চার দিন অসহনীয় কষ্টের মধ্যে থাকার পর রাজন শেষ পর্যন্ত একটি হাসপাতালে পৌঁছাতে সক্ষম হন। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তিনি রাশিয়া থেকে পালিয়ে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে ক্ষতিপূরণ চাইলে মিজানুর রহমান রাজনের পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন, তাঁদের ওপর হামলার চেষ্টা চালান এবং হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রাজনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ-সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করা হয়।
২০ জনের মৃত্যু, ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে
তদন্তের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, রাশিয়ায় নেওয়া প্রায় ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুজন পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। বাকি আটজনের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় রাশিয়ার স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। এসআরবি জানিয়েছে, মিজানুর রহমান বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে বিমানে রাশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন। রাশিয়ায় পৌঁছে কাজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরে ভুক্তভোগীরা মিজানুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান। তবে তিনি তাঁদের আবেদনে সাড়া দেননি বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তদন্তে দুই প্রতিষ্ঠানের নাম
এই মানবপাচারের ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামে আরও দুজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। বাকি বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছে এসআরবি। এ ছাড়া পাচার নেটওয়ার্কে হেরেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত এই চক্রের সঙ্গে দুই রুশ নাগরিকেরও সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন এসআরবির কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করা এবং পুরো পাচার নেটওয়ার্কের কার্যক্রম উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আ.দৈ/এসআর



















