তুরস্কে ‘নূহের নৌকা’র খোঁজে অনুসন্ধান, রাডার ও মাটির নমুনায় যা মিলল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নূহের নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ হিসেবে আলোচিত ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ ঘিরে এবার ভূগর্ভস্থ রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করছেন গবেষকেরা।
গবেষণাকে ঘিরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দলও এলাকায় কাজ করছে। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে। তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি বলেছেন, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য দোগুবায়াজিতকে বেছে নেওয়া হলে অঞ্চলটির পরিচিতি আরও বাড়তে পারে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এবং ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে গবেষণার এসব তথ্য উঠে এসেছে।
১৯৫৯ সাল থেকেই রহস্যের কেন্দ্র
দুরুপিনার ফরমেশনটি তুরস্কের দোগুবায়াজিত জেলার তেলচেক গ্রামের কাছে এবং আরারাত পর্বতের আশপাশে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক আকৃতির এই ভূগঠন শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই স্থানটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হলেও এটি নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ—এমন কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের একটি অংশ বরং এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন বলে মনে করেন।
রাডার স্ক্যানে ভূগর্ভে ফাঁপা কাঠামোর ইঙ্গিত
বর্তমান গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তুরস্কের সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা। তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। গবেষণার শুরুতে এলাকার বিভিন্ন অংশের জিপিএস তথ্য সংগ্রহ করে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এবং অরথোফটো তৈরি করা হয়। এরপর ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে বিশেষায়িত রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
গবেষকদের দাবি, রাডার স্ক্যানে ভূগর্ভে কয়েকটি ফাঁপা বা শূন্যস্থান পাওয়া গেছে। এর কিছু অংশ দেখতে করিডর বা কক্ষের মতো বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এসব জায়গা নিয়ে আরও পরীক্ষা চালাতে কোর ড্রিলিং ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে গবেষণা দলের দাবি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, একটি সম্ভাব্য করিডরের দৈর্ঘ্য ২৫০ ফুটেরও বেশি হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে সরু কোর ড্রিলের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ স্থানে বিশেষ রোবট পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ‘গোফার’ নামের ওই রোবট দিয়ে উচ্চ রেজ্যুলেশনের ভিডিও ধারণ এবং মাটির নমুনা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব কাঠামোকে নূহের নৌকার অংশ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি। আনাদোলুর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, নৌকা আকৃতির এই ভূগঠনের ভেতরে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যেও পার্থক্য
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। ফক্স নিউজে মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ফরমেশনটির ভেতরের ও বাইরের মাটির মধ্যে জৈব পদার্থ এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে। জোন্সের দাবি, বাইরের মাটির তুলনায় ভেতরের মাটিতে প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ রয়েছে। একই সঙ্গে ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রাতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। গবেষকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের ক্ষয়ের ফলে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।তবে এই ফলাফলকে নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়নি। আরও নমুনা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষকেরাই জানিয়েছেন।
নূহের নৌকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়
দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহের নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা কয়েক দশকের পুরোনো। একইভাবে এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে দেখার মতও দীর্ঘদিনের। ১৯৯৬ সালের একটি গবেষণায় ফরমেশনটিকে নূহের নৌকার অংশ নয়, বরং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল বলে নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে। আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের একটি অংশও মনে করেন, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সমন্বয়ে তৈরি এই গঠন ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণে নৌকার মতো আকৃতি পেয়েছে।
এর আগে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ডও এলাকায় গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি এটিকে প্রাচীন জাহাজের জীবাশ্মীভূত অবশেষ বলে মনে করেছিলেন। তাঁর মাপ অনুযায়ী ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬৪ মিটার, যা বাইবেলে বর্ণিত নূহের নৌকার আনুমানিক ১৫৭ মিটার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি।
ফরমেশনের আশপাশে পাওয়া বড় কিছু পাথর নিয়েও নূহের নৌকা তত্ত্বের সমর্থকেরা দাবি করেছিলেন, সেগুলো প্রাচীন জাহাজের নোঙর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সংশয়বাদীরা এসব পাথরকে ভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক বা ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পরে ফ্যাসোল্ড নিজেও নূহের নৌকার তত্ত্ব থেকে সরে এসেছিলেন বলে নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ত্রিমাত্রিক গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার স্ক্যানেও ভূগঠনের নিচে কিছু অস্বাভাবিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরও দুই বছর চলতে পারে গবেষণা
বর্তমান গবেষণায় সংগৃহীত মাটির নমুনা আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে। অধ্যাপক আতিলার মতে, শীতকালজুড়ে নমুনাগুলোর বিশ্লেষণ চলবে এবং কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফল পাওয়া যেতে পারে। তবে পাহাড়ি এলাকায় শীতের কারণে মাঠপর্যায়ের কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে গবেষণার কিছু অংশ আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে। গবেষকেরা আরও দুই বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
নূহের নৌকা ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম—তিন ধর্মের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই দুরুপিনার ফরমেশন সত্যিই নূহের নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে স্থানটি ধর্মীয় গবেষণা ও পর্যটনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত গবেষণায় পাওয়া রাডার সংকেত, ভূগর্ভস্থ কাঠামো বা মাটির রাসায়নিক পার্থক্য—কোনোটিই নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। চলমান পরীক্ষাগুলোর ফলই এ বিষয়ে পরবর্তী বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তি হবে।
আ.দৈ/এসআর




















