সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, এখনো বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে ব্যস্ত সরকার
২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধনের লক্ষ্যপুরণ নিয়ে সংশয়
শাহীন রহমান

আর মাত্র সাড়ে তিন বছর। এরপরই শেষ হবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর সময়সীমা। সেই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশকে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের অগ্রগতি বাড়লেও এখনও শতভাগ নিবন্ধন থেকে দেশ অনেক দূরে।
একই সঙ্গে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য প্রশাসনিক তথ্য একীভূত করে কীভাবে অবশিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে সে বিষয়ে বাস্তবায়নের গতি ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে ২০৩০ সালের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত দেশের নাগরিকদের মাত্র ৫০শতাংশ নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। হাতে সময় বেশি নেই। অথচ এখনও শর্ত পুরণের বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে ব্যস্ত সরকার।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় সুত্রে জানা গেছে বর্তমানে দেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন হার যথাক্রমে ৫০% ও ৪৭%, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড় হারের তুলনায় অনেক কম।
অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার শতভাগে উন্নীত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে নিবন্ধনের আইনি দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হলে এই লক্ষ্য অর্জন দ্রুততর হবে। একই সঙ্গে এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯ অনুযায়ী সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ত্বরান্বিত করবে।
যদিও এ বিষয়ে জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, “শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদানের কোন বিকল্প নেই। ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আইন শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনবল সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তঃখাত সমন্বয়হীনতা দূর করা বিশেষভাবে জরুরি।”
তবে এই ধরনের পদক্ষেপ শর্ত পুরণে কতাটা সহায়ক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় এই ধরনের দায়িত্ব প্রথম অনীহা প্রকাশ করে। যদিও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনের সংশোধনী আনতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছে গ্রামের মানুষের মধ্যে এখন এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। হাসপাতালের বাইরে সনাতনি পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করানো হচ্ছে। আর একটি চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা। যেখানো পৌছানে এখনো কঠিন বিষয়।
এর বাইরেও দেশে বাল্যবিবাহ এখনো একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হলেও দেশের অনেক এলাকায় অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ইউনিসেফ, বাংলাদেশ মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ তথ্য অনুযায়ি বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে গেছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেয়ের বিয়ে ১৫ বছর বয়সের আগেই হয়ে যায়।
এই অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের আবার এনআইডি নেই। ফলে সন্তানের জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনী ডকুমেন্টও নেই। এছাড়া রয়েছে প্রযুক্তিগত জটিলতা। তথ্য সংশোধনের মতো সমস্যা। এসব বিষয়ে নজর না দিলে শতভাব শর্ত পুরণ করা অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইন বার্থ এন্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফর্মমেশন সিস্টেম, রেজিস্ট্রার্ড জেনারেলের কার্যালয় জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে জন্মনিবন্ধনের সংযোগ এসব উদ্যোগ এই অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে তারা বলছেন এই অগ্রগতিই লক্ষ্য অর্জনের নিশ্চয়তা নয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গতিতে এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে, যদি না নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, আইন সংশোধন, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক তথ্য আদান-প্রদান এবং কেন্দ্রীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন গড়ে তোলার কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু জন্মনিবন্ধনের হার বাড়ানো নয়; বরং জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, তালাক, অভিবাসন এবং ঠিকানা পরিবর্তনের তথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। একটি কার্যকর সিআরভিএস থাকলে সরকার প্রতিদিন জানতে পারে দেশে কতজন জন্ম নিচ্ছে, কতজন মারা যাচ্ছে, কোথায় জনসংখ্যা বাড়ছে বা কমছে এবং কারা স্থান পরিবর্তন করছে। তখন প্রতি ১০ বছর পরপর ব্যয়বহুল প্রচলিত আদমশুমারির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)ও ভবিষ্যতে নিবন্ধনভিত্তিক জনশুমারিতে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছে। বিবিএসের কৌশলগত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, শক্তিশালী প্রশাসনিক ডেটাবেস গড়ে উঠলে ধীরে ধীরে প্রচলিত জনশুমারির পরিবর্তে নিবন্ধনভিত্তিক জনশুমারি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারি ব্যয় কমবে এবং তথ্য আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি ১৬.৯) অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে, যার অন্যতম ভিত্তি জন্মনিবন্ধন। বাংলাদেশও এই লক্ষ্য অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২২ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে হাসপাতালভিত্তিক জন্মনিবন্ধন জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য তথ্যভান্ডারের সঙ্গে নিবন্ধনব্যবস্থার সংযোগ তৈরি করা।
তবে বাস্তব চিত্র এখনও উদ্বেগের। গবেষকরা বলছেন, দেশের অনেক এলাকায় এখনও শিশুর জন্ম বাড়িতে হয়, অনেক মৃত্যু নিবন্ধিত হয় না, আবার ঠিকানা পরিবর্তন বা বিদেশে গমনাগমনের তথ্যও নিয়মিত হালনাগাদ হয় না। ফলে প্রকৃত জনসংখ্যার হিসাব ও সরকারি নিবন্ধনের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়। সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আইনগত অগ্রগতি হলেও সার্বজনীন কভারেজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় এবং বাস্তবায়নে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, শুধু জন্মনিবন্ধন শতভাগ হলেই আদমশুমারির প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে এমন ধারণা সঠিক নয়। কারণ জনশুমারি শুধু মানুষের সংখ্যা গণনা করে না; একজন নাগরিক কোথায় থাকেন, কী কাজ করেন, কতটুকু শিক্ষিত, তাঁর পরিবারের অবস্থা কী, আবাসন, পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, প্রতিবন্ধিতা—এসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক তথ্যও সংগ্রহ করে। এগুলো উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য অপরিহার্য।
তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নিবন্ধনভিত্তিক জনশুমারি পরিচালনা করছে। সেখানে নাগরিকের জন্ম, মৃত্যু, জাতীয় পরিচয়, কর, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ঠিকানার তথ্য একই প্রশাসনিক কাঠামোয় সংরক্ষিত হয়। ফলে ঘরে ঘরে গিয়ে আলাদা করে জনশুমারি করার প্রয়োজন হয় না বা খুব সীমিত পরিসরে করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনেও একই সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সে জন্য দ্রুত আইন সংস্কার, হাসপাতালভিত্তিক বাধ্যতামূলক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেসের আন্তঃসংযোগ এবং নাগরিকদের জন্য সহজ নিবন্ধনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ২০৩০ সালের প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
তাদের ভাষায়, সময় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্য অর্জনে হাতে আছে মাত্র সাড়ে তিন বছর। এই সময়ের মধ্যে কেবল নিবন্ধনের হার বাড়ালেই হবে না; গড়ে তুলতে হবে এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল নাগরিক নিবন্ধনব্যবস্থা, যার ওপর ভর করেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যয়বহুল প্রচলিত আদমশুমারির পরিবর্তে আধুনিক নিবন্ধনভিত্তিক জনশুমারির যুগে প্রবেশ করতে পারবে।
আ.দৈ/আরএস












