সংগঠন চাঙ্গা করতে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়াচ্ছে বিএনপি
বিশেষ প্রতিনিধি

ঈদের পরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশ কেন্দ্রের
রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান চাপ, সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তৃণমূল কাঠামোকে পুনর্গঠন ও সক্রিয় করার ওপর। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু কেন্দ্রভিত্তিক সিদ্ধান্ত বা জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি দিয়ে বিরোধী রাজনীতির চাপ সামাল দেয়া সম্ভব নয়; বরং ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংগঠনকে শক্তিশালী করাই টিকে থাকার মূল ভিত্তি।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি বর্তমানে একটি তৃণমূল নির্ভর পুনর্গঠন কৌশল” বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো মাঠপর্যায়ে নেতৃত্বকে পুনরায় সক্রিয় করা, সংগঠনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা ইউনিটগুলোকে কার্যকর করা। বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মাঠপর্যায়ের সংগঠনকে কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই। এই কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন সরাসরি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা বাড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছে।
দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেন্দ্র থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তৃণমূলকে সক্রিয় করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। এই কৌশলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বাতিল এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিষ্ক্রিয় ইউনিটগুলো পুনরায় চালু করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাসব্যাপী কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিতে সারাদেশে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে সব জেলা-মহানগর এবং দলের স্বীকৃত অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে কর্মসূচি দেয়ার জন্য আপনাদের নির্দেশ দেয়া হলো।
বিষয়টি গুরুত্বসহকারে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে। কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, আগামী এক মাস দেশজুড়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এর মধ্যে থাকবে উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা, মিছিল এবং সরাসরি গণসংযোগ।
জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন— সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এ কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলা-মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারে থাকার কারণে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলো পালন করতে থাকব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা।
এই পরিস্থিতিতে দলটির ভেতরে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, কেবল কেন্দ্রীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে মাঠ দখল রাখা সম্ভব নয়। বরং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত ও সক্রিয় কর্মী কাঠামো ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃণমূল কাঠামোই নির্ধারণ করে দেয় কোন দল মাঠে কতটা শক্তিশালী। কেন্দ্র যতই শক্তিশালী হোক, স্থানীয় সংগঠন দুর্বল হলে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়।
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির তৃণমূল নির্ভর কৌশলের একটি বড় অংশ হলো অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার। দীর্ঘদিন ধরে কিছু এলাকায় নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিভক্তি এবং কোন্দল দলীয় কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, “আগে অনেক সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে আসত, কিন্তু বাস্তবায়নে সমস্যা হতো। এখন স্থানীয় বাস্তবতা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে সংগঠন কার্যকর হয়।”
আরও পড়ুন
তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার কৌশল॥ তৃণমূল শক্তিশালী করার এই প্রক্রিয়ায় তরুণ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা তরুণ নেতাদের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, তরুণদের যুক্ত করলে সংগঠনে গতিশীলতা বাড়বে এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটবে। রাজনৈতিক কৌশল না টিকে থাকার লড়াই॥ বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিএনপির এই তৃণমূলমুখী পদক্ষেপ কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি “টিকে থাকার কৌশল” হিসেবেও কাজ করছে।
কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠন দুর্বল হলে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মতে, আগামী দিনগুলোতে স্থানীয় রাজনীতি, মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং কর্মী সক্রিয়তাই নির্ধারণ করবে বিএনপি কতটা কার্যকরভাবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় থাকতে পারবে।
সব মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক চাপ, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিএনপির তৃণমূলমুখী এই কৌশলকে দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পুনর্গঠন কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, এবং তা রাজনৈতিক মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এই কৌশল সফল হলে বিএনপির সংগঠন নতুন করে গতি পেতে পারে; আর ব্যর্থ হলে তৃণমূল শক্তি আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাবে।
আ.দৈ/আরএস













